কূটভাস
ধারা
§
এপিমেনিডেস
মানুষের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই। একটা
ধাঁধাঁ—নদীতে ভাসতে থাকা ষাঢ়ের পচা দেহ, একটি কাকও কোথাও
ওড়ে না। আমাকে প্রশ্ন করুন—আমি কী করতে পারি। নিজেকে প্রশ্ন
করুন বা না করুন, আপনি-ই বা কী করতে পারেন। মানুষ ধ্বংস হোক
ধ্বংস হোক ধ্বংস হোক। বকনা বাছুরটির তখনও শিং ওঠেনি, তখনকার
স্মৃতি ঘাসের শরীরে লালা ঝরায়। জীবনের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই।
§
জেনো
যেভাবে মৃত্যু যাপন করছি—পা বাড়িয়ে—স্থির,
দৌড় উদ্ভাবন করি। রোদে জ্বলা বালির তীর, পাতা
ঝরে। ঝরে যাক ঝরে যাক সব পাতা ঝরে যাক। মানুষ তখন দেখলো শীত যাচ্ছে মানুষ তখনও
দেখলো শীত...। শিয়াল ডাকলো, নবজাতক জন্মের চিৎকার দিলো—এক পা এগিয়ে—মৃত্যু। সব চিৎকার শেষ হোক, শেষ হোক, নিঃশেষ হোক
§
বুদ্ধ
বন্ধ ঘরের দরজা—ঘরে ঢুকে যাই—খুলি—আর বের হই না। একদা বৃষ্টি ছিলো। এখন কেবল কান্না—শীতরাত।
ঠাণ্ডা লাশের বুকের শান্তি—পৃথিবীতে শান্তি নামুক শান্তি
নামুক শান্তি নামুক। বকনা বাছুর বাতাসে গোঁত্তা খায়—গোলানিনী
গাভির ওলানে হাত দেয়—আঙুল গলে—গলে।
নাচের আভরণ খুলে মারকন্যা তাকায়—দুধের ঘ্রাণে পিতলের বালটির
রঙ বদলায়। দিগন্তের তাল গাছের মাথায় যুবকের লাশ—দড়ি ঝুলে—মাটি ছুঁয়েছে
§
বরুণ
মানুষ মানুষ এবং মানুষ—শব্দ উচ্চারিত হয়—শব্দ
উচ্চারণ করে। কে দিগন্তের ছায়া হয়ে গেলো না? কে? মানুষগুলো ছায়ার হয়নি—ঝরের আগমুহুর্তে আকাশ—সত্য সত্য এবং সত্য, ছায়ার অনস্তিত্ব মিথ্যা নয়—অস্তিত্ব
§
প্লেটো
সত্যের নায়ক পাওয়া গেলে সব কথাই সত্য হয়—রোদ দৃশ্যের ছায়া
কেটে বের হয়ে আসে। আত্মহত্যার নামে তখন ছায়া কেটে রক্তাক্ত করেছি। হেমলকের বাটি
ভেঙে ক্রুশের কাঠে রোদ—রোদ চাই রোদ চাই রোদ চাই। দরজা খোলা
ছিল—বের হই—ঢুকে পড়ি
অনুরণন—প্রতিধ্বনি
§ ক
সাতটি তারার তিমির—উদযাপনে বাতাসে মৃতের অনুরণন যাপন। তারা
খুব ভালো ঘুমায়, অনুশোচনাহীন আঘাত করতে পারে। চড়ুইপাখি দুটি
জানালার পর্দায় কয়েকবার গোঁত্তা খেয়ে সুতায় আটকে যায়। শাশ্বত ছায়া রোদে আটকে গেছে।
ডিসেম্বরে এসে তাদের বলুন, আসলে আর স্থবিরতা নেই, বয়স্কদের অসহায় মৃত্যু মানুষকে নিজের অস্তিত্বে আরও বিশ্বাসী করে। যতোই
তীব্র আঘাত করুক, প্রতিধ্বনি তাদের ঘুমে পৌছে প্রতিঘাত করে
না। মায়ের খসখসে ত্বকের চামড়া একদিন ভেড়ার পশমের মতো মোলায়েম হয়, চুলগুলো পাটের ফেউয়ার মতো ওড়ে। পিতার চোখের মাকড়শার জালে ফড়িং আগুন খুঁজতে
এসে আটকে থাকে। আর কোনো শৈশব কম্পাঙ্ক ফড়িঙের পিছু ছুটে হারমোনি সৃষ্টি করে না।
§ খ
তাকে হয়তো প্রতিধ্বনি বলে—আমরা সেবার ঘুড়ির পেছনে ছুটে ছুটে
দুপুরের জল ফুটানো নীরবতায় শকুন খুঁজে পেয়েছিলাম
§ গ
যেবার শীতের শেষে সার্কাসের হাতি গ্রামে আসলো, মা আমাকে বাড়িতে
একা রেখে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো জানি না। আমি যতোবার মাগো বলে চিৎকার করেছি,
দুপুরের রোদ কেটে কেটে হাতির অচেনা রব-ই ফিরে এসেছিলো। পিতা সেদিন
বাড়ি ফিরে আসেনি। দুপুরের রোদ পড়লে, ক্লান্ত কাঁটা কাঁটা
চোখে মা ফিরেছিলো—দেখি, তার হাতে কিছু
পথভাঙা ফুল, আঁচলে এক ঝাঁক ডুবতে যাওয়া সূর্য—অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে লাফিয়ে পড়লো
কলসি
§ ক
অশ্রু, বীর্য বৃথা যায়—নদী প্রবাহিত হয়—শরীর ভাঙে। যাপিত জীবনের অর্থ টিকে থাকা নয়। ডুবে যায়, ভেসে ওঠে, পূর্ণ হয়, যখন ফাঁকা
শূন্য তখনও অর্থ থাকে। রজঃরক্ত, যাপনের ইতিহাস—যেভাবে শিলার ভাঁজ দেখে বয়স মাপা হয়—বোধ বিষাদ কোলাহল
এগোয়। হেলে পড়ে, কুঁজো হয়, আবার দাঁড়ায়,
আবার হাঁটে। পূর্ণ হয়, শূন্য হয়।
§
খ
মাটির কাঁচা পোড়া কলসি কোমরে সেই যে নববধূ নদীতে জল আনতে
গেলো, যাপিত জীবনের ইতিহাস তার সাথে কী খেলা-ই না খেললো, মাটি
মাটিতে মিশলো, জল জলে।
§ গ
কোমরের কালশিটা দাগে কোনোদিন তেল মালিশ করা হয়নি। ব্যাথার
ভাঁজখোলা পরিতৃপ্তি জীবনদৃষ্টিতে প্রবাহিত হয়েছে। এখন শূন্য নদী, পরিত্যাক্ত কলস,
বিলুপ্ত যৌবন নির্লিপ্ত বিষণ্নতায় হা করে আছে।

অদ্ভুত এক বিষাদবরণ সত্যে মাখামাখি প্রতিটি ছত্র।
ReplyDelete