ছেঁড়া পাতা
অদিতি
কর্তা অফিসে চলে
গেছে। ছেলে স্কুলে। ওবেলার রান্না সারছিল মিতা। টুটুলের বন্ধুরা
এসে পড়বে সন্ধ্যা না হতেই। হাত চালাচ্ছিল ঝটপট।
আজ টুটুলের
জন্মদিন। একরকম জোর করেই স্কুলে
পাঠিয়েছে। যদিও সঙ্গে বন্ধুদের দেওয়ার
জন্য গিফটগুলো ছিল। না হলে যে ছেলেকে স্কুলে পাঠানো যেত না ভালো করেই জানে মিতা।
ভোর পাঁচটা থেকে
দিন শুরু হয় মিতার। দিনভরই চলে ছোটাছুটি। রান্না, টুটুলকে স্কুলে
দিয়ে আসা-নিয়ে আসা, পড়ানো, আবৃত্তি ক্লাস, সাঁতারে নিয়ে যাওয়া, ক্যারাটে ক্লাসে নিয়ে যাওয়া। এভাবেই কেটে যায় মিতার সারাদিন। তোলা কাজ মানে ওই ঘর মোছা, সাবান কাচা আর বাসন মাজার জন্য
সবিতা আছে বটে। কিন্তু ম্যাডাম আধাঘণ্টার বেশি
থাকবেন না কিছুতেই। হাজার টাকায় এর বেশি সময় নাকি
দেওয়া যায় না। সঙ্গে মাসে তিনদিন ছুটি। তাই অল্পবিস্তর বাসনও মেজে নিতে হয় মিতাকে। কাজের লোকের জন্য মাসে হাজার টাকার বেশি বরাদ্দ করতে
গায়েই লাগে বড্ড। তিনটে তো মানুষ। সুবীর কাজ করে
একটা প্রাইভেট ফার্মে। কুড়ি-বাইশ মতো পায়। কিন্তু যা দিনকাল ওই টাকায় আর কত ভালো ভাবে থাকা যায়!
মিতা যতটা পারে সংসার খরচা কমানোর চেষ্টা করে।
সকালে রান্না
তেমন কিছু করেনি। ঝোলভাত খাইয়ে বাপ-ছেলেকে অফিসে
আর স্কুলে পাঠিয়েছে। বিকেলে টুটুলের দুই বন্ধুকে আর
তাদের মায়েদের আসতে বলেছে। পাড়ায় ঢোকার
মুখে একটা নতুন বিরিয়ানির দোকান হয়েছে। বাড়ি ফেরার সময়
সেখান থেকে বিরিয়ানি আনতে বলেছে সুবীরকে। কেক আর মিষ্টিটা গতকাল বিকেলে বেরিয়ে নিজেই এনে রেখেছে মিতা। টুটুলকে নিয়ে গিয়েছিল মিও অ্যামোরেতে। বাজারও সেরে
নিয়েছে তখনই ঘুরে ঘুরে। চিকেন, পায়েসের চাল, গরম মশলা, চিকেন মশলা, আলাদা করে অল্প
ছোট এলাচ, কিছুটা সবজি।
চিকেন পকোড়া, পায়েস আর চিকেন কষাটা নিজে হাতেই বানাবে মিতা। এই দুপুরেই করে নিতে হবে সব। দু’ কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটটা দু’দিন ধরে গুছিয়েছে। যাই হোক, টুটুলের বন্ধু আর তাদের মায়েরা আসবে তো। ঘরদোর একটু অগোছালো বা আতিথেয়তায় কিছু কার্পণ্য
দেখলেই স্কুলের গেটে শুরু হয়ে যাবে ফিশফিশানি। এখন আবার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও শুরু হয়েছে। কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে স্কুলের বন্ধুদের গিফট প্যাক করতে হয়েছে। এখন বেশ ঘুম ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ঘুমোলে চলবে না। মনে মনে ভাবল
মিতা। চিকেনটা কাল রাতেই ম্যারিনেট
করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখেছে। এবার বের করতে
হবে। ঠান্ডাটা না কাটলে রান্না বসাতে পারবে না।
দুধের প্যাকেট
সকালেই বের করে রেখেছিল। মিছরি আর চিনি দিয়ে দুধটা
জ্বাল দেওয়ার পর চালটা ঢেলে নাড়তে নাড়তে বেশ গন্ধ ছেড়েছিল। তখনই মনে পড়ল, ছোট এলাচ দিতে ভুলে গেছে। তাড়াতাড়ি কাল সন্ধ্যায় আনা কাগজের মোড়কটা বের করে মিতা। ছোট এলাচটা বের করে
নিয়ে ফেলতে যাবে কাগজটা মুড়িয়ে। হঠাৎ একটা চেনা
কিছু চোখে পড়তেই কেমন খটকা লাগে মিতার। মোচড়ানো কাগজটা
ফেলতে গিয়েও ফেলে না। ভালো করে দু’-তিনবার হাত বুলিয়ে খানিকটা সোজা করে। তারপর
ভালো করে তাকাতেই চারিদিকটা যেন দুলতে শুরু করল চোখের সামনে। সিংকটা ধরে না ফেললে হয়তো পড়েই যেত মিতা। ‘শেষের কবিতা’— জন্মদিনে মিতাকে অনি, ১৩/০৭/২০০৪।
এক ঝাপটায় পনেরো
বছর আগে পৌঁছে গেছে মিতা। উলটোরথের দিন। মিতার জন্মদিনও ছিল সেদিন। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন ধরে। মা কিছুতেই বেরোতে দেবে না। বাড়িতে তখন সবাই জানতে পেরেছে অনির কথা। যৌথ পরিবার হাঁড়ি যদিও সবার আলাদা। মেজোজেঠিমা মাকে কথাও শুনিয়েছে ‘মেয়েকে একটু দেখ। মুদির দোকানের হারুর ছেলের সাথে এখানে-ওখানে ঘুরে
বেড়াচ্ছে। তোর ভাসুরদের চোখে পড়লে কিন্তু
খুব খারাপ হবে। কলেজে পড়ানোর কী দরকার ছিল! অত ভালো সম্বন্ধটা এনে দিলাম বিয়ের। দিয়ে দিলে তো বংশের মুখে কালি দিত না।’
মা, বোন দু’জনেই বুঝিয়েছিল অনেক। ‘বাবার ওই ছোট
মুদির দোকান। তোর সঙ্গেই তো পড়ে। পড়াশোনাতেও বিশাল কিছু না। তার ওপর বাড়িতে দুই দিদি।’ বোন নীতা বলেছিল, ‘ইশ্ কী গুন্ডা গুন্ডা দেখতে। সারাদিন সাইকেল নিয়ে ঘোরে আর দাদাগিরি করে। দিদি আর ছেলে পেলি না?’ মা বলেছিল, ‘মিত্রবাড়ির মেয়ে কিনা ওই বস্তির বাড়িতে গিয়ে থাকবে! কেন যে মরতে
কলেজে পড়াতে গেলাম! তোর বাবা জানতে পারলে জ্যান্ত পুঁতে দেবে।’
কিন্তু অষ্টাদশী
মিতার মন জুড়ে তখন শুধুই অনি।
জোর করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল বান্ধবীর
বাড়িতে নোটস নিতে যাচ্ছে বলে। গঙ্গার ধারে
দেখা করেছিল। ওখানেই দেখা করত তারা। সময়
কোথা দিয়ে পার হয়ে যেত বড় বটগাছটার নীচে বসে। দু’-এক ফোঁটা বৃষ্টি তখনও পড়ছে। সঙ্গে গঙ্গার জোলো হাওয়া। নীল রঙের একটা
চুড়িদার পরে গিয়েছিল মিতা। চোখ বন্ধ করলে
ছবির মতো ভেসে ওঠে আজও সেই দিনটা। অনি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। গুন্ডা টাইপ ছেলেটা তার সামনে এলেই কেমন শান্ত হয়ে
যেত। অসাধারণ আবৃত্তি করত। সেদিনও ‘আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি’ শুনিয়েছিল আর রবিঠাকুরের শেষের কবিতা দিয়েছিল। আজ লালচে হয়ে যাওয়া সেই পাতাটাই মিতার চোখের জলে ভিজতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা নামার পর কত কথা, কত ভবিষ্যতের
পরিকল্পনা করতে করতে হাত ধরে ফিরছিল দু’জনে। গলির মুখে বাবার
সঙ্গে দেখা।
পরের মাসের পনেরো তারিখে আর এক
বৃষ্টিভেজা শ্রাবণের সন্ধ্যায় সুবীরের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। বাবা-মার খুব ভয় ছিল গুন্ডামার্কা ছেলেটা আবার না কিছু ঝামেলা পাকায়। কিন্তু মিতা জানত অনি কোনো ঝামেলা কেন আর কোনোদিন ওর
সামনেই আসবে না। বিয়ের একসপ্তাহ আগে মা আর বোন
অনির সব স্মৃতি শেষ করে দিয়েছিল। ‘শেষের কবিতা’
হয়তো রক্ষা পেয়েছিল সেদিন। আজ বুঝতে পারছে।
পায়েসের পোড়া
গন্ধে হুঁশ ফেরে মিতার।
আবার সব নতুন করে
করতে হবে।
যেমন পনেরো বছর
আগে করেছিল।

No comments:
Post a Comment