।। বাক্‌ ১৪৬ ।। সম্পাদকীয় : অনুপম মুখোপাধ্যায় ।।

 



২০২০ ফুরিয়ে এল। আবার কিছু নতুন কবি আসবে, আর তাদের দাগিয়ে দেওয়া হবে আসন্ন দশক দিয়ে। এখনই এ নিয়ে সচেতন হওয়ার দরকার আছে।

একটি দশক কোনো বিচ্ছিন্ন কালখণ্ড নয়। যেমন ধরা যাক ষাটের দশক। এই দশক যখন শুরু হচ্ছে, তার মধ্যে পঞ্চাশের দশকের ছাপই খুঁজে পাওয়া যাবে, কারণ পঞ্চাশের দশকের কবিরা ষাটের শুরুতেই নিজেদের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাচ্ছেন। প্রত্যেক দশকের কবিরাই প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেন তাঁদের পরের দশকের প্রথমার্ধে। তখনই তাঁদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর গড়ে ওঠে। অথচ তাঁদের চিহ্নিত করা হয় সেই দশক দিয়ে যে দশকে তাঁরা কোনো ছাপ রাখতে পারেননি, নবাগত ছিলেন, প্রভাবিত ছিলেন, কেউ কেউ হয়ত থেমেই গেছেন, আর এগোতেই পারেননি, অথবা বাকি জীবনটা গুরুত্বহীন কবিতা লিখে কাটিয়েছেন। সেইভাবেই একটি দশক যখন ফুরিয়ে আসে, তার মধ্যে পরের দশকের সামাজিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ষাটের শেষের দিকেই সত্তরের কবিতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, নকশাল আমলের পূর্বাভাস ফুটে উঠছিল। তাই, ভাস্কর চক্রবর্তী বা প্রভাত চৌধুরী বা পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে ষাটের কবি বললে, তাঁদের পরিচয় খণ্ডিতই হয়। জয় গোস্বামী তাঁর প্রকৃত কবিজীবন আশির দশকে খুঁজে পেয়েছেন, আশির দশকের জীবন আর সমাজই তাঁর প্রধান উপজীব্য ছিল, তাঁকে সত্তরের কবি বললে কিছুই বলা হয় না। বরং ভাস্কর চক্রবর্তী বা পুষ্কর দাশগুপ্তের কবিতায় সত্তরের সমাজ অনেক পরিস্ফূট, যদিও তাঁদের ষাটের কবি বলা হয়।

বিদেশি সাহিত্যের আলোচনাতেও কালপর্ব চিহ্নিত করা হয়, যেমন এলিজাবেথীয় যুগ, বা ভিক্টোরীয় যুগএকটা যুগ আর একটা দশক এক নয়। একটা দশকের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাযোগ্য চরিত্র থাকে না। যে কালখণ্ডের সেটা থাকে, তাকে যুগ বলা হয়। সাহিত্য শিল্পের আলোচনায় যুগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা কেবল সময়ের হিসাব নয়, তা একটা দেশের জাতির ইতিহাসের অঙ্গ। এলিজাবেথীয় যুগ বা ভিক্টোরীয় যুগ সমগ্র ইংল্যান্ডের সমাজকে ধরে। কিন্তু বাংলা দশক ব্যবস্থা কেবলমাত্র কলকাতার সময়কে ধরে। যখন বলা হচ্ছে আশির দশক, তখন সেটা কলকাতার দশক, বাকি পশ্চিমবঙ্গে ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১৯৮০-র পরবর্তী পরিসর একই হলেও বাস্তবে আলাদা। পুরুলিয়ার সমাজে তখন ষাটের দশক চলছে, যদি সার্বিক বিচার করা হয়, সুন্দরবনের কোনো গ্রামে তখন ১৯২০ চলছে, যদি জীবন যাপন দেখা হয়। যদি বলা হয় সুলতানি আমলের কবিতা, তাহলে সমগ্র বাংলাকে ধরা যায়, কারণ ওই আমল কেবল ক্যালেন্ডারকে নয়, সমগ্র দেশবাসীর জীবনকে ধরে। একইভাবে যদি বলা হয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা কবিতা, তাহলেও তা অনেক বিজ্ঞানসম্মত ও ইতিহাস সচেতন হবে, এবং আলোচনার বিস্তার অনেক বেশি হবে। একটা দশক থেকে সমগ্র দেশের ছবি পাওয়া যায় না, এবং একটা বিপুল দেশের সব কবির চরিত্র ফুটেও ওঠে না। স্থানকে বাদ দিয়ে সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থই হল আপনি প্রতারিত হবেন, কারণ সময় নিজের থেকে কিছুই বলে না। একটা দিনও সারা পৃথিবীতে একই সময়ে শুরু বা শেষ হয় না। একটা দশক বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন টাইম ফ্রেম নিয়েই আসতে পারে। এই দশক ব্যবস্থা কলকাতার আধিপত্য ধরে রাখার একটা অস্ত্র মাত্র।

বাংলা কবিতার কবিদের আলোচনা যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মেপে করা হয়, এ এক ঔপনিবেশিক মানসিকতা। অবশ্যই বাংলা ক্যালেন্ডার মেপে করলেও তা অবৈজ্ঞানিক হত, কিন্তু ব্রিটিশের রেখে যাওয়া ক্যালেন্ডারের প্রতি এই আনুগত্য বুঝিয়ে দেয় আমরা আজও কত পরাশ্রয়ী। অথচ আমরাই নাকি বাংলা আর বাঙালি নিয়ে বড্ড বেশি সংবেদনশীল, ভাষা দিবস নিয়ে ফাটিয়ে দিই। কেউ যদি বলেন এটা জন্মতারিখের মতো, তাহলে প্রশ্ন ওঠে একজন সাহিত্যককে কি তাঁর আঁতুড়ঘর দিয়ে মাপবেন, নাকি কর্মক্ষেত্র দিয়ে? জন্মতারিখ আর সাল লাগে চাকরির জন্য। পাসপোর্টের জন্য। ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য। কয়েকদিন আগেই মারা গেলেন গৌরাঙ্গ মিত্র। তাঁর লেখালেখি শুরু মোটামুটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পরে। অথচ তাঁর বয়স তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাই নতুন কবিদের পত্রিকা ‘বৃষ্টিদিন’-এ তিনি ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। কেন এটা তাঁকে করতে হত? কারণ বাংলা সাহিত্যের অবৈজ্ঞানিক দশক ব্যবস্থা।

আমি দশকের প্রথা নিয়ে যখন সচেতন ছিলাম না, আশির দশকের কবিতা নিয়ে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক কাজ করেছিলাম একটি পত্রিকায়। সেখানে দেখতে পেলাম যাঁদের আশির দশকের কবি বলে চিহ্নিত করা আছে, তাঁদের একের সঙ্গে অন্যের বিপুল প্রভেদ। অথচ তাঁদের একটি ক্যাটিগরিতে ফেলা হচ্ছে! এ এক অদ্ভুত সরলীকরণ! এতে যেটা হয়, একজন কবির ব্যক্তিগত সার্থকতা ও ব্যর্থতাকে আড়াল করে দেওয়া হয়, এবং তাঁদের মধ্যে একটা বিশেষ ঝাঁকের গুণ আরোপ করা হয়। এতে যাঁরা দুর্বল কবি তাঁদের একটা সুবিধা হয়, তাঁরা দশক ভিত্তিক আলোচনায় যোগ্যতা না থাকলেও উল্লেখ পেয়ে যান, তাঁদের কবিতা দশক ভিত্তিক সংকলনে স্থান পেয়ে যায়। কিন্তু এতে প্রকৃত কবিরা অবমানিত হন, কারণ ওই একই আলোচনা বা সংকলনে তাঁদের একই মর্যাদা আর মাপ নিয়ে থাকতে হয়। মুড়ি মিছরির এক দর হয়ে যায়।

বাংলার বিখ্যাত কবিদের দশকে ফেলে বিচার করার দুঃসাহস কিন্তু করা হয় না। নজরুল ইসলামকে কোনো দশকে ফেলা হয় না, যদিও তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত কবি। জীবনানন্দকে দ্বিধার সঙ্গেই তিরিশের দশকে উল্লেখ করতে হয়, তার একটা কারণ বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তাঁর সংযোগ, অন্যথায় তিনি রেহাই পেয়ে যেতেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য আর সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রায় সমবয়সী ও একই দশকের হলেও সুকান্তের ক্ষেত্রে তাঁর দশকের উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। প্রেমেন্দ্র মিত্রকে যে তিরিশের কবি হিসাবে প্রায় ধরাই হয় না, তার কারণ তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু আর তাঁর গোষ্ঠীর অস্বস্তি ছিল। সুনীল-শক্তিকে পঞ্চাশের কবি হিসাবে ধরা হয়, কারণ তাঁদের সময় থেকেই দশক ব্যবস্থা জাঁকিয়ে বসছে, এবং তাঁরাও চাইতেন যেন তিরিশের দশকের কবিদের চেয়ে তাঁদের সুনির্দিষ্ট পার্থক্য থাকে, অন্যথায় তাঁদের তিরিশের কবিদের সামনে খেলো আর বাণিজ্যিক মনে হবে, আর মলয় রায়চৌধুরী বা ফাল্গুনী রায় বা তুষার রায়দের সঙ্গেও তাঁরা একটা প্রভেদ চাইতেন, সেটা তাঁদের দশক ব্যবস্থা দিয়েছিল, এবং তাঁদের প্রশ্রয় ও বদাণ্যতাতেই বাংলা কবিতায় দশকের হিসাব বিচার আর আলোচনা জাঁকিয়ে বসে। স্বদেশ সেন পঞ্চাশের কবি কেউ জানে? জানলেও মানতে পারে?

আপাতত দশক ব্যবস্থা যেটা করছে, সত্তরের বা আশির কবি এখনো লিখছেন তাঁরা কি চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগের কবিতা লিখছেন? আসলে তাঁরা দশককে স্বীকৃতি দিয়ে ২০২০-র তাজা কবির সঙ্গে তুলনাটা এড়িয়ে যাচ্ছেন তাজা কবিও ভাবছে সে বেশ আছে তরুণ হয়ে, বৃদ্ধ কবির ওজনটা তাকে নিতে হচ্ছে না আসলে এগুলো স্টাফরুম আর ক্লাবঘরের কালচার ছাপোষাপনা ২৫ বছর বয়সী কবি অপেক্ষায় আছে কবে তাকেও নতুন কবিরা দাদা বা দিদি বলবে আবার আশি বছর বয়সী কবিও দাদা হয়ে বসে আছেন, দাদু তিনি হবেন না মধ্যবিত্ত মাঝারিয়ানার চরম উদাহরণ এই দশক প্রথা

বাংলা কবিতার সবচেয়ে বড় অভিশাপ এই মুহূর্তে ছাপোষাপনা এবং একটা সীমায় নিজেকে উল্লেখিত দেখার আশায় কোনো গোষ্ঠী বা গুচ্ছে আটকে থাকার মানসিকতা। এর প্রচুর সুবিধা করে দেয় দশক প্রথা।

                                  অনুপম মুখোপাধ্যায়

                                  পরিচালক- অনলাইন বাক্‌

 

 


3 comments:

  1. অতি সঙ্গত আলোচনা। এ বিষয়ে আমি সহমত পোষণ করছি। 🙏

    ReplyDelete
  2. আমি সম্পূর্ণ একমত। কিছুদিন আগে এ বিষয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। আপনার লেখাটি বরাবরের মতো দারুণ।

    ReplyDelete