।। বাক্ ১৪৬ ।। গল্প ।। শহরের পুরোনো বেহালাবাদক : দীপ শেখর চক্রবর্তী ।।



শহরের পুরোনো বেহালাবাদক

দীপ শেখর চক্রবর্তী

 

আমাদের এখানে সেই রাজা যে সাইকেল দু’হাত ছেড়ে একটা কঠিন মোড় পার করতে পারে। তাদের প্রতিই মেয়েদের চূড়ান্ত উন্মাদনা। বুকের ভেতর থেকে রুমাল বার করে তারা এই সমস্ত ছেলেদের উদ্দেশ্যে উড়িয়ে দেয়। ঠোঁট সরু করে একটা অদ্ভুত শব্দ করে যাতে তাদের সমস্ত প্রশংসা ঠিক মতো পৌঁছয় তাদের উদ্দেশ্যে।

অথচ আমার বেগুনি রঙের মেয়েদের সাইকেলটিতে হাত ছেড়ে চালানোর থেকেও বেশি ভাবতে হয় কখন চেন পড়ে যাবে। এরপর বাকিটা রাস্তা হাতে কালি মাখিয়ে ফিরে আসতে হবে কারণ সহস্রবার চেষ্টা করেও আমি কখনওই সাইকেলের চেন আবার তার পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে দিতে পারিনি। বাবার কাছে এই বিষয়গুলো খুব সহজ। এত বছর ধরে নিজের সাইকেলটাকে এমন তেজি ঘোড়া করে রেখেছে। প্রতি রবিবার নিয়ম করে এখনও মোবিল দেয়, মাসে একবার সাইকেল সারাইয়ের দোকানে। যদিও বাবার সাইকেলকে কোনোকিছুই তেমন কাবু করতে পারে না তবু বাবার মতে কোনোকিছুকে অবহেলাই একপ্রকার পাপ।

অথচ এত বছর প্রায় সমস্ত কিছুর মতোই সাইকেলকে অবহেলা করেছি আমি। পেছনের চাকাটি এখনও টাল সামলে উঠতে পারে না। বেলটি সর্বদা নিম্নমুখী। কখনওই সঠিক সময়ে আমি বেল দিয়ে উঠতে পারি না। এই সমস্ত অবহেলা কিশোর বয়সে যতটা আনন্দ দিত এখন ততটা ভালো লাগে না।

অথচ প্রতিদিন একটা আশ্চর্য ভয় ঘুমের মধ্যে গলা টিপে ধরে। মনে হয় একদিন এমন আসবে যেদিন আমার জীবনের সাইকেল চালানোর মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে। এর থেকে কঠিন ভয় হয়তো গোটা জীবন ধরেই আমি পাইনি। যাকে মানুষ অবহেলা করে তার সঙ্গে সম্পর্কটি ঠিক এমনই একদিন শেষ হয়ে যায়। আচমকা। সেই মুহূর্তটি এত কঠিন নয়, কঠিন পরবর্তী দিনগুলো যখন এই নতুন অভ্যেসের সঙ্গে মানুষকে মানিয়ে নিতে হয়। আমাদের প্রত্যেককে এই ভেঙে যাওয়া দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে এবং আমার মনে হয় এটি ঈশ্বরের একপ্রকার পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ঈশ্বর আমাদের বড় করে তোলেন, যোগ্য করে তোলেন, যাতে করে সামনের আরও বড় বিচ্ছেদগুলো আমরা আরও সহজভাবে পেরিয়ে যেতে পারি আমার বাবা এই হাত ছেড়ে চালানো সাইকেলের কেরামতি দেখিয়েই মাকে তাঁর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। নইলে বাবার কিছুই ছিল না প্রায়। সমুদ্রের ধারে বসে বাবা বিক্রি করতেন প্যাকেটজাত বিশুদ্ধ রোদ এবং তখনও মানুষের পক্ষে এই বিশুদ্ধ রোদ সম্পর্কে কোনোপ্রকার ধারণাই গড়ে ওঠেনি। মায়ের সেলাই শিখতে যাওয়ার ইস্কুলের কাছের মোড়টা যেভাবে বাবা সাইকেলে দু’হাত ছেড়ে পার হয়ে যেত সেই সুখ্যাতি এখনও এই এলাকার দিকে দিকে প্রচলিত আছে।

বাবা এখনও মজা করে বলে যে ইস্কুলে পড়ার পর একমাত্র বাবার জীবনটাই মা ভালো করে সেলাই করে দিতে পেরেছে। শোনা যায় মায়ের সেলাই দক্ষতা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে বাবা কখনও তাঁর পুরোনো ট্রাম্পেটটা নিয়ে সমুদ্রের পাশে বসে একটা সুর ঠিকঠাক মতো বাঁধতে পারত না তখন মা-ই এগিয়ে আসত বাবার সাহায্যে। সেইসব সুর একটা মায়ার মতো আমাদের বাড়িতে থেকে গেছে এবং পুরোনো ছবিগুলো এখনও অবসর পেলে সেই গানটা গায়। জানি না এর মধ্যে বাবার বিশুদ্ধ রোদ বিক্রি করার ব্যবসাটা যদি ফুলেফেঁপে না উঠত তবে হয়তো এই সুরগুলো বিক্রি করে দিতে হত আমাদের। এমনটা হলে নিশ্চিত ভাবেই আমাদের পরিবারে এত সুখ থাকত না।

ঠাকুমার সব সময় শাপশাপান্ত করার মুখটা সেলাই করে দেওয়ার পর থেকে ঠাকুমার অভিশাপেই মায়ের সেলাই দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকেনইলে অনায়াসেই আমার ব্যর্থ লেখাগুলো মাকে দিয়েই সারিয়ে নিতাম। একজন পুরুষের জীবনে মেয়েরা তো চিরকাল এমন দক্ষতার সঙ্গেই রয়ে গেছে, নিঃশব্দে, গোপনে। তাই এত বছর নানারকম আশ্চর্য স্বাদহীন খাওয়া খেয়েও আমাদের পরিবারে কখনও সুখের অভাব ঘটেনি।

লেখার সঙ্গে সাইকেল চালানোর এই যোগ খুব গভীর। এজন্য কৃতজ্ঞ বাবার কাছে যে ছোটবেলাতেই এমন বেগুনি রঙের মেয়েদের সাইকেলটি কিনে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। বেগুনি কারণ বাবা বলেছিল এটি রামধনুর মুখ্য রং হয়তো প্রথম রং বোঝাতে চেয়েছিল বাবা। মেয়েদের সাইকেল কেন, এই কথা জিজ্ঞেস করাতে বাবা বলেছিল প্রত্যেক প্রতিভাবান শিল্পীরই এমনটি করা উচিত অথচ সাইকেলটির বিন্দুমাত্র যত্ন নিতে পারিনি আমি। বাবার সুনামের যথার্থ মর্যাদা রাখতে পারিনি বলে অধিকাংশ সময়েই নিজেকে অত্যন্ত অপরাধী লাগে।

তবে এক-একসময় এই অপরাধবোধই একটা আশ্রয় হয়ে ওঠে। সমুদ্রের ধার দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর ডানদিকে বাঁক নিলে একটা ছোট চার্চ। সেখান থেকে আরও কিছুটা যাওয়ার পর প্রেমিক-প্রেমিকাদের খেলা করবার জন্য প্রজাপতি পার্ক। আর-একটু গিয়ে খালটা পার করলেই বন। সেই বনের ভেতর অনেকটা ঢুকে সাইকেলটা রেখে আমি একমনে ভাবি। এই ভাবনার ভেতর থেকেই আমি মায়ের মতো আমার পুরোনো ছেঁড়া লেখাগুলোকে যথাসম্ভব সেলাই করার চেষ্টা করি। অথচ বাবা-মায়ের প্রতিভা যে ছেলের মধ্যেও থাকবে, এমন কোনো চিহ্ন আজ অবধি খুঁজে পেলাম না। সেই বনের মধ্যে বরং সাইকেলটি খুব নিশ্চিন্তে আরামে শুয়ে থাকে।

এই বনের দক্ষিণ দিকে একটা পুরোনো ক্যাফে আছে। সেখানে সন্ধেবেলার দিকে নাকি খুব ভালো ট্রাম্পেট বাজানো হয়। বাবা মাঝে মাঝে ওই জায়গাটিতে নিয়ে যেত আমাদের। ওখানকার মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে খুব ভালো যোগাযোগ আছে বাবার। এক-একদিন তাদের সঙ্গে কিছু একটা বাজিয়েও আসে বাবা। দামি জায়গা বলে ওখানে খুব একটা যাওয়া হয়ে ওঠে না। এক-একদিন সপ্তাহ শেষে যখন পর্যাপ্ত মাছ এবং গম কেনার পর হাতে বেশ কয়েকটা উজ্জ্বল পয়সা থেকে যায় তখুনি আমরা এরকম ক্যাফেতে যেতে পারি। তবে এখানকার গান ঠিক আমাদের মতো নয়। বাবার যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল তার কিছুই আমি দেখতে পাই না এখানকার মিউজিশিয়ানদের মধ্যে। বরঞ্চ যে লোকটি বেহালা বাজায় ছোট শহরের মেজাজটা, মায়াটা তার সুরেই কিছু কিছু ধরা পড়ে।

দশ মিনিটের রাস্তাটা যেতে প্রায় আধঘণ্টা হয়ে যায় বারবার চেন পড়ার জন্য। বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে চুপ করে গাছেদের ভাষাটা শিখে ওঠার চেষ্টা করি। এই ভাষা শিখলে আমাদের ওখানে খুব কদর আছে কারণ কেবল কয়েকজনই এই ভাষাটা জানে। এবং লাভ হবে। আমাদের শহরের বিখ্যাত পাগলটির সঙ্গে কয়েকটা ভাবের আদানপ্রদান করতে পারব জানতে পারব ওর বেহালাটি কোথা থেকে কিনেছিল। এমন উৎকৃষ্ট বেহালা আমাদের অঞ্চলে প্রায় কারও নেই। বাবা বলে প্রত্যেক পাগলই আসলে একজন এমন দক্ষ সংগীতজ্ঞ যে তার নোটেশনগুলো হারিয়ে ফেলেছে।

বড় বাজারের ভেতর দিয়ে যখন লম্বা এবং বাতিল পুরুষাঙ্গটি দোলাতে দোলাতে কাঁধে বেহালাটি নিয়ে পাগলটি হেঁটে যেত তখন পথের ধারে রঙিন মেয়েরা তাকে দেখে চিৎকার করে উঠত অথচ পয়সা অথবা মস্তিষ্কের সুস্থতা না থাকলে সমস্ত পুরুষাঙ্গই বাতিল। অথচ খুব ভালো করে জানতাম আমি এই শহরের সমস্ত পুরুষদের তুলনায় পাগলটিকেই সবথেকে পছন্দ করত মেয়েরা সেই অপূর্ব বেহালাটির কথা ভেবে তাদের সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠত অথচ তাদের মালকিনদের যারা দাম মেটাতে পারে না সেই সমস্ত পুরুষেরা এক-একটা পাক্কা শুয়োরের বাচ্চা। ফলে এই প্রেম কখনওই পূর্ণতা পাওয়ার নয়

ঠিক এমন একটা মোড়েই কবে যে মনিকার সঙ্গে আমার বন্ধুতা হয়ে গেছিল ভুলে গেছি। মনিকার চোখদুটোর মধ্যে আমাদের গরীব সমুদ্রটার একটা অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি দেখেছিলাম যেখানে কখনও কোনো পর্যটক আসেনি। শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যর্থ মিউজিশিয়ান বিকেলবেলার আলোটা গায়ে মেখে ট্রাম্পেট বাজায় এবং সেই সুর হয়তো সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে প্রবাহিত হয়ে শান্তি দেয় নিঃসঙ্গ মানুষকে। তবে মনিকার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটি হওয়া কঠিন ছিল কারণ ওর মালকিন আমার মতো পয়সাহীন ঢ্যামনাদের দিকে ওকে তাকাতেই বারণ করেছিল। এদিকে মনিকারও কোনোপ্রকার আগ্রহ হওয়ার কথা নয় কারণ আমি এখানকার চমৎকার পুরুষদের মতো দু’হাত ছেড়ে সাইকেল চালানোর পদ্ধতিটি কখনওই আয়ত্ব করে উঠতে পারিনি।

আমার ছিল একটা বেগুনি রঙের মেয়েদের সাইকেল। তার সামনে কোনোপ্রকার বসার জায়গা না থাকার ফলে পেছনের কেরিয়ারই ছিল একমাত্র ভরসা। প্রেমের অর্ধেক এখানেই শেষ হয়ে যায় কারণ সুযোগমতো অন্ধকারে সাইকেল থামিয়ে হাতের দু’পাশ থেকে প্রেমিকার বুকে হাত রাখার সুখ এতে করে অনুভব করা যায় না। ঘাড়ের কাছে ঠোঁট এনে তার সমস্ত শরীরে ঢেউ তোলাও এভাবে সম্ভব নয়। এছাড়াও আমার সাইকেলটি যত না চালানোর তার থেকে অনেক বেশি হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার। ফলে সব সময় তৃতীয় একজনের উপস্থিতি থাকে। তবু মনিকার পছন্দ হয়েছিল আমাকে, কেন এই রহস্য কোনোদিন কারও পক্ষেই জানা সম্ভব নয়।

আমরা লুকিয়ে চার্চের পাশ থেকে প্রজাপতি পার্কটায় যাই না। বরং চলে যাই বনটায়। সেখানে নিজের মতো করে থাকা যায় অন্তত গাছেদের চোখের দৃষ্টি মানুষের মতো নোংরা নয়। অনেকটা সময় বনের ভেতর পাতাদের আশ্রয়ে শুয়ে থাকি আমরা, গাছেদের ভাষা শিখি। মনিকা বলে একসময় ছবি আঁকা শিখত ও। প্রতিদিন একটা নতুন ছবি আঁকার নেশা ধরে গেছিল বিশেষত সেই দিনগুলোতে যখন ওর বাবা নরম হাতটা জোর করে ঢুকিয়ে নিত প্যান্টের ভেতরে। মনিকার মনে আছে ওদের বাড়ির কথা যার পাশেই ছিল একটা চামড়ার কারখানা। বুক ভরে সেই গন্ধটা নিতে বারান্দায় বেরিয়ে আসত মনিকা এবং জল দিয়ে ফেলত ওদের ক্যাকটাস গাছগুলোতে।

এক-একদিন বনের ওপারের ক্যাফেটায় আমরা এমন সময় যেতাম যখন ওখানে একেবারেই লোক থাকে না। ফলে একটা পানীয়ের দামে ওখানে আর-একটি পানীয় বিনামূল্যে পাওয়া যেত। এইটুকু দাম মেটানোই আমাদের পক্ষে কঠিন ছিল তবে যখন পুরোনো বেহালাবাদক তার মায়ার শহরের সুরটা বাজাত তখন ভাবতাম জীবনে এর থেকে বড় সুখ আর কিচ্ছুটি নেই।

কী অপরূপ এই মায়া। ধরে রাখা যায় না, কী করব বুঝে ওঠা যায় না, সব সময়ই হাত ফসকে ফুরিয়ে যাচ্ছে অথচ আরও আরও পূর্ণ করে দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। ছোট শহরের হলুদ হ্যালোজেনের আলোতে যখন পথ চলতাম আমরা তখন মনে হত গোটা আকাশ-বাতাস জুড়ে বেজে চলেছে পুরোনো ট্রাম্পেট। হয়তো এই শহরের পুরোনো প্রেতেরা গাইছে যত গান হারিয়ে গিয়েছে আমাদের। যত গান আমরা বিস্মৃত হয়েছি। সমুদ্রের যেদিকটায় একেবারেই লোকে যায় না সেই দিকটায় মাঝে মাঝে বড় একটা নৌকার গলুইয়ের ওপর বসে থাকি দু’জনে। আমাদের বন্ধুতার সমস্ত মানে সমুদ্রের কালো-নীল রেখার মতো দুলে দুলে চলে। খুব অস্থির লাগে আমার এভাবে সমুদ্র দেখতে। মনে হয় যদি একটু স্থির হয়ে যায় সমুদ্রটা কখনও এতসব ঢেউ থেমে গিয়ে শান্ত হয়।

হাত ছেড়ে সাইকেল চালানো ছেলেদের দলটি আমাদের দিকে টিটকিরি দিতে দিতে এগিয়ে গেলে মনিকাকে আর-একটু কাছে নিয়ে আসি। ওর সারা শরীরে অজস্র আঘাত, বুঝি ব্যবসায় মন না দেওয়ার ফলে এগুলো তার মালকিনের শাস্তি। মনে হয় এক-একদিন ওর মালকিনের সমস্ত পয়সা মিটিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি মনিকাকে, রেখে দিই আমাদের সামান্য বাড়িটায়। অথচ কোনো টাকাই আমার কাছে নেই। বাবার প্যাকেটজাত রোদ বিক্রির ব্যবসা যতই আলোর মুখ দেখুক না কেন কোনোদিনই তা মনিকাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়।

অর্থহীন এই ভবিষ্যতের দিকে আমরা সবাই এভাবে চলেছি অথচ এই ছোট শহরের মায়ার মতোই কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে খুবই ইচ্ছে করে। মনিকার শক্ত হাতের মতো কিছু একটা যা মানে দেবে। হয়তো আমার ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে যাওয়া লেখাগুলো একদিন এতটা আলো হয়ে উঠবে যাতে করে মনিকাকে আমি ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে পারব ওই বাজারটা থেকে। তবে যে ছেলেটি আমাদের শহরে হাত ছেড়ে সাইকেল চালানোর আশ্চর্য রীতিটি এখনও শিখে উঠতে পারেনি তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব এমন একটি বই লিখতে পারা যা তাকে নিয়ে যেতে পারে খ্যাতির শীর্ষে?

এই ব্যর্থ লেখাগুলো মা সেলাই করে দিতে পারে না তাই প্রতিদিন মনিকার কথা লিখি। লিখি ওর সঙ্গে প্রতিদিনের এই টুকরো টুকরো সময়গুলো। ওর চোখের মধ্যে রয়েছে আমাদের এই সমুদ্রটাই। কখনওই কোনো পর্যটক আসেনি এখানে। এই সমুদ্র আসলে আমাদের সামান্য জীবনের মাঝে একটা স্বস্তি। কিছুক্ষণ ঢেউ দেখার একটা বিলাসিতা।

আর একমাস পর বসন্তকালের ছুটি। অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকেরা এবং তাদের পিছু পিছু আসা গুন্ডা মাফিয়ারা ভিড় করবে এখানকার বাজারে। ফুলে উঠবে মালকিনদের ব্যবসা। মনিকাকে তাদের খাতির বেড়ে যাবে। আমাদের এই বনের ভেতরের জীবন, ক্যাফেতে বেহালা শুনতে যাওয়া এবং নৌকার গলুইয়ে বসে সমুদ্র দেখার দিন ফুরিয়ে যাবে। অথচ যে বইটি লেখার ছিল আমার তার কিছুই এখনও হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিন সমুদ্রপাড়ের রাস্তায় আমার বেগুনি রঙের মেয়েদের সাইকেলটা নিয়ে যেমন কিছুতেই শিখে উঠতে পারছি না কীভাবে সাইকেলের দু’হাত ছেড়ে পেরোতে পারব একটা খুব কঠিন মোড়।

এক মাস। তার মধ্যে কোনো খ্যাতি আসে না। কোনো জাদু এসে রাতারাতি বদলে দিতে পারবে না আমাদের জীবন। আমি জানি বাবার এই প্যাকেটজাত রোদের ব্যবসাটায় একদিন অন্ধকার নেমে আসবে। মায়ের সেলাইয়ের দক্ষতাও একদিন প্রয়োগের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। গভীর রাতের এক সামুদ্রিক ঝড়ে খুলে খুলে পড়বে আমাদের বাড়ির পুরোনো ছবিগুলো। কোনো গান বাজবে না আর কোথাও।

মনিকাকেও হয়তো খুঁজে পাব না আর কোথাও। এই কালস্রোতে একটা সম্পর্ক এভাবে হারিয়ে যাবে। অন্য পুরুষের সঙ্গে রাত্রিযাপন করে বিকেলে যে অদ্ভুত বেদনাপূর্ণ নিষ্ঠুরতায় তাকিয়ে থাকে আমার দিকে ও, সেই অপরাধবোধ বাড়িতে এসে লিখে রাখি শাদা খাতায়। মনে হয় মুখে রক্ত তুলে লিখি অথচ লেখা বিষয়টি সর্বদাই নিজের রক্তটাকে এভাবে নিজেই গিলে ফেলতে শেখা।

কোনো বই কখনও সম্পূর্ণ হয় না। কোনো লেখাও। তবু দিন বেশি নেই। মাত্র একটা সপ্তাহ। শেষ গল্পটি লেখা বাকি রয়েছে আমার, অথচ সমস্তকিছুই ফুরিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আমার আর কোনোকিছুই নেই, বুকের ভেতরটা সমুদ্রের ধারের মতোই একা নির্জন, শোঁশোঁ করে একটা খুব তীব্র বাতাস বইছে শুধু।

তবু শেষ একটা গল্প আমার বইটিকে সম্পূর্ণতা দেবে। হাতে একটা মাত্র সপ্তাহ তারপরে শুরু হয়ে যাবে বসন্তের ছুটির দিনগুলো। মনিকার সঙ্গে সমুদ্রের ধারে এসে বসেছি। আজ আর নৌকার গলুইয়ের ওপরে না, যে জায়গাটায় বাবা ট্রাম্পেট বাজাত এবং মা এসে সেলাই করে দিত বাবার সুরগুলো ঠিক সেই জায়গাটায়। বুকের ভেতরটা ঝড়ের পূর্বের পরিস্থিতির মতো ফাঁকা হয়ে আছে। মনিকা আজ অন্যদিনের থেকে বেশি চুপ। মনে হয় আমার ওপরে সমস্ত আশা হারিয়ে ফেলেছে ও।

সাইকেলটায় মনিকাকে বললাম উঠে আসতে। তবে বালির মধ্যে এমন সন্ধেবেলা সাইকেল চালানো খুবই কঠিন। কঠিন মানে একপ্রকার অসম্ভব। মনিকার কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে জোর করলাম। ও এসে বসল আমার পেছনে। হাতটা জড়িয়ে ধরল আমার তলপেট। আমি চালাতে শুরু করলাম ভিজে যাওয়া বালির অংশটায়। এখানে সাইকেল চালানো অপেক্ষাকৃত সহজ। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফেরালাম সমুদ্রের দিকে।

‘—কী করছ দীপ? পাগল হলে নাকি?’

‘—তুমি কি জানো না পৃথিবীর সমস্ত পাগলই আসলে একজন দক্ষ লেখক যে তার শেষতম গল্পটা লিখতে পারেনি?’

সমুদ্রের দিকে যত এগিয়ে যাচ্ছি দেখি সমুদ্র পিছিয়ে যাচ্ছে তত। হুহু করে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। মাঝেমাঝে একটা-দুটো ঢেউ ছোবল মারতে আসছে। তবু ভীত একটা পশুর মতো মাঝেমাঝেই পেছন ফিরে পালাচ্ছে সমুদ্রটা।

আরও জোরে চালাচ্ছি সাইকেল। মনিকার হাত দুটো শক্ত করে ধরেছে আমার তলপেট। আরও বিশ্বাস সেই হাতে। আমার মাথার মধ্যে তখনও এক আশঙ্কা কখন চেন পড়ে যায় সাইকেলটির। থামতে পারব না আমি। থামলেই নিশ্চিত গিলে খাবে এই সমুদ্র। আরও আরও দ্রুত হচ্ছে আমার বেগুনি রঙের মেয়েদের সাইকেলটি। সমুদ্র পিছিয়ে যাচ্ছে এবং আকাশ-বাতাস জুড়ে বেজে চলেছে এক অদৃশ্য ট্রাম্পেট। আকাশ দক্ষতায় সেলাই করে নিচ্ছে নক্ষত্রগুলো।

হাত উঠে গেছে আমার সাইকেলের দু’ হাত থেকে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে শাদা বালির খাদ। সমুদ্র পালাচ্ছে, দূরে আরও দূরে। আমি জানি আমাদের হাতে মাত্র আর একটা সপ্তাহ কিন্তু এভাবে চললে অনায়াসে পার করে যেতে পারব এই বিশাল সমুদ্রটি। যেখানে কখনও কোনো পর্যটক আসেনি। শুধুমাত্র একজন বেহালাবাদক পুরোনো শহরের সুরটা বাজাতে বাজাতে একদিন পাগল হয়ে যায়।

নতুন এক পাগল এসে প্রতিস্থাপিত করে শহরের পুরোনো পাগলের দুটো জ্বলন্ত চোখ আর খিদেকে।


No comments:

Post a Comment