।। বাক্ ১৪৬ ।। গুচ্ছ কবিতা ।। সাজ্জাদ সাঈফ।।

 


*দ্রাঘিমালন্ঠন-০১

এইভাবে কোন‌ও কোন‌ও রাতে

দ্রাঘিমালন্ঠনে আলোকিত হয় সম্পর্কের ঝার!

 

সুদূর বনানী জ্বেলে এক পরাহত জোছনার মুখ

উজ্জ্বলতর, এইভাবে গোপন দরোজা খুলে

রাত্রি বেড়িয়ে পড়ে, ক্ষীণ স্বরে গায় অনন্ত ব্যাঞ্জনা!

 

আর, স্মৃতি হতে পালকঝরা পাখির ফোঁপানো মুখ

অবিকল রক্তবর্ণ লাগে-

 

যেনো তুমি অপাপবিদ্ধ কেউ, অচেনা সবুজবীথি

কুড়াতে এসেছো গাঁয়ে!

 

খল মেঘে ছেয়ে আছে ঘর, চেনা অক্ষর!

 

 

-

*দ্রাঘিমালন্ঠন-০২

 

ছায়া ভরে আছে মিষ্টি বাতাসে-

'তে ভর করি নিরঙ্কুশ, করোটি জাগিয়ে রাখি নীল নিদ্রার ধারে, কঙ্করে!

যে কোনো প্রতিশ্রুতি তারকাখচিত জামা, ঝলমলে আর খুব সতর্কতাকে চায়!

 

হেঁটে আসে অবগাহনের কাল, অস্তিত্বের টিমটিমে আলো নিয়ে যতখানি হাঁটা যায়;

ঘুমের ভেতর জল ও দ্বিধার নদী, উথাল পাথাল, সমস্তই প্রেতপরিহাস

জ্যোতিরাডারের নীচে সবটাই উড়ুক্কু মাছের খেলা!

 

পাতা ওল্টানোর শব্দমাত্র বই থেকে মধু ও ময়ূরের চোখ

গভীর অরণ্যে জ্বলজ্বল করে।

 

 

 

*দ্রাঘিমালন্ঠন-০৩

 

এই যে ঘুরে বেড়াচ্ছে শিস, পাখিদের গতজন্ম, মেঘ শিকারী ঠোঁটের পাখিরা তোমাকে চেনে?

 

আর তুমিই বা কেমন হাভাতের মতো চাও

শরতগুল্মের ছোঁয়া, পারাবত ঘূর্ণি, যেদিকে চোখ যায়

পাতাবাহারের ধারে ঘর, ঠুমরি বাজছে কারো

অশান্ত মগজে, স্নেহ চাও তুমি? নৈরিৎ কাঞ্চন?

 

তোমাকে হীরণ বর্তুলে কেউ ফেলে গেছে নাকি প্রেম?

চারিদিকে ঠাট্টার‌ সমাবর্তন, কোনদিকে যাবে তুমি?

 

 

*দ্রাঘিমালন্ঠন-৪

*

যেদিকে গিয়েছে চলে খুর দাগা পথ

যেদিকে আলচিহ্ন, নির্বিঘ্ন; স্রোতের শেষে গান

রোদের বিশ্রাম, যে হাতে কিন্নরী ফুলেরা হাসে

জ্যোতি ও জগত পিরান লাল, নিশ্চয়ই তার ধারে

তুমিও নির্জনতা চাও, আর চাও পত্রবাহকের মতো চোখ

বহুদূর নির্ঘুম; বহুদিন খুঁজছো শিমুল!

 

যেখানে লোমঝরা স্নান

ফেলে গেছে গ্রামের পশুরা, তুমি তার ধুলাবালি চেনো;

ঘুঘুদের মাঠে পায়ের ঝুমুর ঘাস, সেইদিকে মেঘ জড়ো, নির্যাস!

 

 

*দ্রাঘিমালন্ঠন-৫

 

অজ্ঞাত সম্রাট তার গ্রীস্মের ছুটি পেয়ে

জীবন্ত নেমে এলো গানে ও গসপেলে

আর দেখো কলমে জমছে রাত্রি, সান্দ্র ও সুরভিতপ্রায় চোখ!

 

এতো ধান স্বপ্নে বেড়ে ওঠে, এতো স্মৃতি

প্রশান্ত করেছে মুখ, আগজন্মের অভিশাপ মনে পড়ে?

অহোরাত্রি, বেতফল ঝরে বুকে?

 

এতো প্রশ্নের মুখে চুপ থাকে একাকীত্ব

করোটি জাগিয়ে রাখি ত্রিবলীরেখায়, প্রিয় সব

নামের অক্ষর খুলে সাফ করে দিই বিক্ষতদাগ!

 

 

 

 *দ্রাঘিমালন্ঠন-০৬

 

যেভাবে অসুখ লুকিয়ে রাখে চরাচর

পাতলা কুয়াশা পেটে নিয়ে ভেসে যায় চাঁদভাব

আরতিধ্বনির দিকে মুখ করে দিগন্তে একটা গাছ

সব দিকে আঁধার ঘনিয়ে একা, মাথা উঁচা করে মেঘেদের

আড়কথা শোনে, তুমি সেই ঘন ইথারের কেউ?

 

অথচ মস্ত সমুদ্রকে গিলে হাই তোলে স্বপ্নের বোয়া সাপ

সামনে রাস্তাঘাট সুস্থির, তিথিনির্জন ধুলি-

 

এতো ফাঁপর লাগা অন্ধকারে সমস্ত ডুবিয়ে ঘাসে

যামিনীতুলিতে কে সে তুলে নেয় অস্তিত্বের জলরঙ?

 

ধীর পায়ে পাহাড়ের কাছে নামে গান, অলস চিতার গায়ে

ডুবছে শিশির।

 

 

 *দ্রাঘিমালন্ঠন-০৭

 

মানুষ বেঁচে থাকতে কাছে টানছে জানালা, শতাব্দীর শেষ গান শুনে শিস বাঁধে পায়রা, মেথিফুল খুলে যাচ্ছে হাওয়ায়, এইদিকে সানগ্লাস, এইদিকে যানজট লেগে ধাক্কা লাগছে মেঘের, হেমন্ত পারাপার থেমে আছে শীতে

মানুষ সামনে গিয়ে ফিরতে চাইছে রণে, কথার দ্বন্দ্বে কথা, অভিলাষ, একদিন সব রকম গল্পে উড়তে আসে পাহাড়।

 

 

 

*দ্রাঘিমালন্ঠন-০৮

 

শোনো পত্রালি পাখিরা

নক্ষত্রের দিকে এগিয়ে হোঁচট খাচ্ছে বাতাস

শোনো সেই ডাক, অনিশ্চয়, নিত্য সমর্পণ

 

যেটুকু হাসিতে ফিরে

আয়না ব্যকুল হলো, এর বেশি কার থাকে ভাষার প্রবাল

বুকে?

 

নত হও ধ্বনি, মাটির ওপর থেকে

যেইভাবে প্রবল কুয়াশা ওড়ে, তুমি সেই অনল দখিনা চেনো?

 

শোনো ঘাস, মাঠের নিঃশ্বাস, থেমে

যতদূর নিরবতা আঁকা, ধ্বনির বিজ্ঞানে...

 

 

 * দ্রাঘিমালন্ঠন-০৯

 

একটা চিঠির মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছে রেড স্কয়ার

ভলগা ধরে ধরে ঘাটের ঘোড়ারা

পাতাঝরা আঁচ করছে শীতের, সামনে তিতির

আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে মানুষ চিনতে পেরেছে

নিজেদের, একটা মাঠের মধ্যে সহস্র অক্ষর জড়ো-

 

একদিন নিজের দিকে ফিরে সমস্ত পাখির

জেগে ওঠে হাহাকার, অতন্দ্র ধমনীঘাটে

রক্তচক্ষু যমুনার সাথে দেখা, কুরুক্ষেত্র চেয়ে আছে এইদকে!

 

একিলিসের গল্প থেকে রক্তবর্ণ বাতাস আসে, ঘোড়াদের চিঁহি;

বাগান জুড়ে বাইবেল, হলুদ আলোয় লুসিফার, ঘাসেদের ধরফর

ফাঁস করে দিচ্ছে সাপের পেটের নিচে, সমস্ত ভাষাকে

আলিফ উঁচিয়ে ডানার ঝাপটা বুঝিয়ে দিচ্ছে জিব্রিল

অক্ষরে অনশ্বরলোক, নিদ্রাতুর, কেরাতে সজীব।

 

আর আমি ইলিয়াসের ঘরের পোলা

চিলেকোঠা পাহাড়া দেই, বাংলা কবিতা।

 

 

  

*দ্রাঘিমালন্ঠন-১০

 

নেমেছি সুবিল পলে, একটা বিসর্গ ডুবে হালকা স্রোতের নিচে

একার হসন্ত আর এইদিকে এসে হেমন্তের রোদ মিছিল সাজিয়ে

মাঠে মাঠে মায়াজাল, হলুদ সরিষামুখ।

 

একদিকে কাত হয়ে দাঁড়িকমাগুলো ভাব করছে মেঘের সাথে

আমাদের জড়ো হলো ঘুম, নিদাঘ দুপুর মেলে দিয়ে বেণী বাঁধে

চেনা রমনীরা, সেইদিকে খড় ভেজা শীত অমায়িক লাগে!

 

নেমেছি গাঙের দহ , এইবেলা সরল সুবিলে

প্রশ্নচিহ্ন জুড়ে ঢেউ, বুকে এক রুটলেস ভাষা

কবিতাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে চাষাভুষাদের হাসি এঁকে দেয়।

 


2 comments: