।। বাক্ ১৪৬ ।। গোঙানি, কমরেড বাবু আর সমুদয় কাব্যিকবিতা ।। রাহেবুল

 


গোঙানি, কমরেড বাবু আর সমুদয় কাব্যিকবিতা: রাহেবুল

 

আমি তো আর ইচ্ছে করে, সাধে-আহ্লাদে, কাউকে বিনোদন দেব ভেবে, এমনকি পরম আনন্দ দেব বলে ভাষাবেগে কথা বলিনি। কবিতা লিখিনি, কবিতা করিনি, কবি হব বলে। কবিতা লিখিনি লোকে আমাকে নিয়ে কথা বলবে, আমাকে নিয়ে হাওয়া গরম হবে, আমাকে নিয়ে হুজুগ রটবে এ কারণেও নয়। কোনো পুরস্কার, কোনো মায়েস্ত্রো কবির পায়ের ধূলি পেতেও তো কবিতা লিখিনি।

                 

আমার মনেহয় গলার ওপর কেউ ধারালো ছুরি, তরবারি উঁচিয়ে আছে। ঘাড়ের ওপর সেই তরবারিকে বলি বোছরে ছুরি। যে মানুষ গরু-মোষ জবাই করে নিয়মিত তাকে বলে বোছর, বোধয় কসাই আর বোছর। আমার এক ফুফা নাকি বোছরছিল মানে তাকে এ নামে ডাকত বাবা, আরও দুএকজনকে ডাকতে শুনেছি। বোছরেরা অনেকটা লম্বা আর প্রায় চকচক করা সেই ছুরি যাকে ধারালো ছুরি বলছি, চোখা ছুরিও বলি তা, গরুর গলায় ফোঁচ দিয়ে জবাই করে। জবাই করে আল্লাহ্‌র নামে। সেই ছুরিটা যেন আমার ঘাড়ে, গলার ওপরগরধনার (গর্দান?) ওপর কেউ উঁচিয়ে। যখন আমি কবি আর কবিতার কথা বলি।

 

বোছরেরা গরু কাটতে ওস্তাদ। বিসমিল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ হু আকবর বলে আল্লাহ্‌র নামে কাটে বলে তা হালাল হয়। এ মতন বলে লোকে। সেই মাংস সকলে সুস্বাদু করে খায়। কবিতা কী? আমি কে? সেই জবাই হতে চলা গরুটাকে ভাবি।

 

কমরেডবাবু (বড়ো আব্বু>বাবু)র কথা মনে পড়ছে। তখনও জানিনা তো কমরেডকাকে বলে, কেনই-বা বলে। তাকে সবাই কমরেডবলেই ডাকত। তার গলা ছিল ঢোঢো গলাবিরাট আওয়াজকথা বললে বহুদূর যেন যায়। সে আসত আমাদের বাড়ি একটা ঝোলা নিয়ে। আম্মা চাল বের করে দিত। কীসের জন্য বুঝতাম না। মাকে বলত ফাতেয়াত্‌ সবাকে যাবার কইস বুড়ির বেটিযদিও ফাতেয়াপড়তে বাবা যেত বলে দেখিনি। আমাকেও নিয়ে যায়নি কদাচ।  কিন্তু কানে ভাসত দারেয়া ঘরসেখানেই হত ফাতেয়াবলত ফাতেয়াঘরও কখনো।

 

অনেক পরে বুঝেছি সে আসলে সত্তরের সেই জমি দখলের ভাগচাষী, বর্গাদারের আন্দোলনের কর্মী ছিল। আর সে আসলে ছিল সিপিএম এর মুখিয়া, হাঁকদার। সেই মানুষগুলো লম্বা ডাকে এক লহমায় প্রচুর মানুষকে একখানে করতে পারত। নজরুল বলে হায়দারি হাঁক 

 

তার নাম কী ছিল? আমি আজও জানিনা। লোকেও তার নাম মনে রাখেনি। সকলে ডাকত তো সেই কমরেডবলে। যেমন কেউ কাউকে ডাকে আলসিয়া’ (অলস), কেউ কাউকে বুড়াবলে, কেউ কাউকে নাঙ্গলকাটা’ (লাঙ্গল কাটবার/বানাবার হস্তশিল্পী) বলে, কেউ কাউকে শকুনবলেএই নামেই যেন লোকগুলি পরিচিতি পায়। তাদের মা-বাপ, কী যারা তাদের লালন করেছিল, তাদের দেয়া নাম লোকে ভুলে যায়।

 

কমরেড বাবুও ছিল বোছর। সে প্রচুর প্রচুর গরু কাটত। আমার ছোটবেলায়, অপুর বিস্ময় ভরা চোখতখনও কাটতে শুনেছি কি? মনে পড়েনা। অবশ্য গরু কাটা বলে না, ওকে সকলে জবাইবলে বা জব করাবলে। গরু জবাইয়ে তার ছিল সুখ্যাতি। সেই খ্যাতি বা সুখ্যাতি বদলে গিয়েছিল শেষ বয়সের শেষ প্রান্তে এসে। লোকে মন ভরে খেত গোস্ত, মাংস, অনেকের কাছেই তা অপরিহার্য এবং সর্বাধিক প্রিয় খাদ্য, যেমন স্বয়ং আমার বাপ। কিন্তু মরবার আগে যখন শরীর অচল, উঠতে পারেনা, হাঁটতে পারে না তখন বাবুর খুব কষ্ট হত। গলা দিয়ে গোঙানি বেরত, ঘরঘর আওয়াজ হত। দূর থেকেই শোনা যায় যেন। তার ছেলেরা বোধ করি ভিক্ষে করে বা সেটার মোলায়েম নামবৃত্তি ছোয়াল করে টাকা তুলেছে তার চিকিৎসার জন্যে। অথবা মনে পড়ছে না সেই বাবুই হয়তো শেষকালে ছোয়ালকরত।

 

যখন ওইভাবে আওয়াজ করত, গোঙানি হত লোকে বলত এটা গরু জবাইয়ের ফল। শাপ লেগেছে। এতগুলা পশু হত্যা আল্লাহ্‌ কী আর দেখে না! অবশ্য প্রকাশ্যে নয় এসব কথা হত ঘরে ঘরে, কতকটা স্বগতোক্তি আওড়ানো টাইপের। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম। শুনতাম মানুষের কথার যুক্তি, কুযুক্তি, সুযুক্তি। মানুষে চুপিচুপি, আড়ালে বলত কমরেড বাবু যে ডাকত, আর্তনাদ করত মাঝেমাঝে, চিৎকার করতগোঙানি হতসে আসলে সেই গলায় ছুড়ি ফোচানো গরুর আর্তনাদ।

 

গরুর গলার রগগুলো কাটলে যাকে বলি নালী’—কাটলে গরুটা তখনও শ্বাস নিতে চাইত আর সেই খাওয়া-খাদ্যের নালী দিয়ে, শ্বাসের নালী দিয়ে বাতাস ঢোকার ঘর্ঘর আওয়াজ হত। হরর সিনেমার সাউন্ডের ঢক

 

আরও কতখানে, কতভাবেএখানেও কবিতা আছেন, ছিল, থাকে। কমরেড বাবু। গরুটা। গরুর গলায় ফোঁচানো উদ্ধত ছুরি। গরুর গোঙানি। বাবুর গোঙানি। গোস্তের সুস্বাদ। সবের মাঝারে আমারও বসত, লক্ষ করি।

 

পাদটীকা:

১. বোছর- যে ব্যক্তি নিয়মিত গরু-মোষ জবাই করেন, কসাই।

২. ফুফা- পিসেমশাই।

৩. ফোঁচ- পোঁচএর উচ্চারণভেদ। দা-ছুরি ইত্যাদি চালিয়ে করাতের মতন করে জবাই করা বা কাটা।

৪. বিসমিল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ হু আকবর- মহান আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি। সাধারণত এমন না বলে পশু-পাখি জবাই করলে মুসলমানরা তাকে হালাল’ (ধর্মানুমোদিত) খাদ্য বিবেচনা করেন না।

৫. ফাতেয়া- কোরানের প্রথম সুরা ফাতিহাযা কোরানের উপক্রমণিকা বিশেষ। এখানে ফাতেয়াত্‌বলতে ফাতেয়াপড়বার অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বুড়ির বেটি- রাজবংশীদের মধ্যে প্রচলিত আদরের সম্বোধন।

৬. দারেয়া- ‘ডারিয়ার উচ্চারণভেদ। বাড়ির বাইরে বসার ঘর, রাজবংশী হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে প্রচলন ছিল, অধুনা লুপ্তপ্রায়।

৭.  ছোয়াল- বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল, অর্থকড়ি সংগ্রহ (চাঁদা?)

৮. রগ- শিরা

৯. ঢক- মতন 

12 comments:

  1. দুর্দান্ত লেখা রাহেবুল ♥

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোমার সঙ্গে লেখাটা প্রকাশের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা হয়েছিল, লেখাটা প্রকাশ হওয়ার আগেই। জানিনা এর পরবর্তীগুলো কোনোদিন লেখা হবে কিনা।

      Delete
  2. খুব ভালো লাগল

    ReplyDelete
    Replies
    1. কবিতার পাশে তুমি নিজেই একজন ভালো গদ্যকার, তোমার ভালো লাগলে সেটা ভালো লক্ষণই বটে!

      Delete
  3. তোমার লেখা স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্যই আমাকে মুগ্ধ করে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. লেখায় যেন সৎ থাকতে পারি...

      Delete
  4. Replies
    1. বেশ। তার রেশ কতদিন টেঁকে সেটাই কথা।

      Delete