দশটি কবিতা
সায়ন্তন চৌধুরী
১
এইসব ছোট ছোট শীতের বিকেল আমিও তো খুঁজেছি,
মেরুহীন মভরঙা আলো, কংক্রিট পরিকল্পনা,
এইসব —
এইসব মায়াবী আপেল, একটু পরে মিউজিয়াম ভেঙে
বিশাল ডাইনোসর উঁকি দেবে ব্যক্তিগত জানলায়।
কাঁচের জানলা দেখলেই আজকাল জলের স্বচ্ছতা
মনে পড়ে; অথবা তুমি ঘুমিয়ে আছো, এরকম
কোনো ভোর, কাউন্ট ড্রাকুলার মতো ঠান্ডা ও একা,
আমাদের শরীরের কাছে এসে স্মৃতিতে অদৃশ্য হয়।
জেগে উঠে দেখি বিপজ্জনক চারপাশে
চাপ-চাপ কালো রক্ত লেপ্টে রয়েছে,
বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অবিচ্ছিন্নভাবে ঝরে পড়ে
গারগোয়েলের ওপর।
গথাম শহর আমাকে পরিশ্রান্ত করে।
২
যখন সূর্য নেমে আসে গথাম শহরে, অতিকায়
স্কাইস্ক্র্যাপার
ও আন্ডারগ্রাউন্ডে জটিল সুড়ঙ্গজাল-সমেত স্থাপত্য
গঠন
আমার চেতনার ভেতর ঢুকে যায়, যেখানে হলদে
অন্ধকারে
লাশগুলো শুকোয় পরিত্যক্ত ম্যানহোলের তলায় —
ধোঁয়া আর কুয়াশায় ভরা সরু সরু গলি,
যার কোণ থেকে অতর্কিতে আততায়ীর হাত
তোমাকে টেনে নেবে ছায়ার ভেতর;
নাগরদোলাগুলি সারারাত ঘোরে, সারারাত নিয়নের
আলো
জ্বলে গথাম শহরে।
ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান অনিদ্রায় কাতর হয়ে জানলা থেকে
লক্ষ্য করে গথামের প্রকাণ্ড ঘড়ি;
রেনপাইপ বেয়ে নিঃশব্দে উঠে আসে বিড়ালমানুষী,
মেঘচেরা জ্যোৎস্নার নীচে তার ধারালো নখ
ফেঁড়ে দেয় আমাদের জিরাফের পোলকা-ডট গলা।
৩
যেকোনো শহরে বৃষ্টি-কামড়ানো সকালগুলো আসলে
বর্ষাকালীন কলকাতার হলোগ্রাফিক প্রোজেকশন,
যাদের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে পোর্তুগিজ ক্যাফে
আর দুষ্প্রাপ্যবইয়ের দোকানগুলির সামনে।
অধিবাস্তব রাস্তা ধরে একটি স্ট্রীটকার
দৃশ্যের প্রান্তের দিকে ক্রমশ বেঁকে যেতে থাকে,
এবং জন অ্যাটকিনসন গ্রীমশ'র ছবির মতো
আলো উপচে আসে স্পর্শক বরাবর।
এখন এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেভাবে
তোমার স্মৃতি সিনেমাহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি ঘিয়েরঙা টিশার্ট-পরা মেয়ের র্যান্ডম অবয়বে
মিশে গেল। উপগ্রহচিত্রে এসব ধরা পড়বে না।
৪
ব্যতিক্রমী স্বপ্ন: ভিশেপেলোম-পোড়ানো আর্মেচারসহ
একটা রোবট-কুকুর সূর্যাস্তকালীনসমুদ্রসৈকত
বরাবর লেংচে বালি ও ঢেউয়ের গাঢ় বাদামী
বর্ডারে এসে থেমে গেল।
তারপর পিছু ফিরল। ফ্রিজশট।
ইলেকট্রিক আকাশ — অতিকায় পিস্টনচালিত
পাখিগুলি গোলাপী রোদ সাঁতরে ফিরে আসছে
সাইবারপাঙ্ক শহরে। প্যানারোমিক দৃশ্য। কাট টু:
একজন কন্ট্রাক্ট-মজুর ভাঙাচোরা মেট্রো স্টেশনে
বসে খবরের কাগজে রিয়েল এস্টেটের
বিজ্ঞাপন দাগাচ্ছে। ক্লোজআপে ধরা হলো।
৫
জানুয়ারীর রাতে যেসব দুঃখিত গোয়েন্দারা
সস্তা বারে বসে একা একামদ খায় এবং তারপর
অদ্ভুত গলিগুলো ধরে অদ্ভুত এলাকাগুলোয় চলে যায়,
তাদের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়না বহুদিন, যতক্ষণ না কেউ তা
আবিস্কার করছে নম্বরহীন গার্বেজ ট্রাকের ভেতর
অথবা সমুদ্র থেকে দূরে কোনো জীর্ণ পরিত্যক্ত
বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে, যেখানে উইস্টারিয়া লতা
ঢেকে দিয়েছে তাদের সন্দেহপ্রবণ মগজ।
অন্ধকার রক্ত তাদের শরীরের গায়ে একটা চ্যাটচ্যাটে
সসের মতো লেপ্টে গ্যাছে: সাহসী গোয়েন্দা, জানুয়ারীর বরফ
তোমার কাদামাখাবুটজুতোর ওপর গলে আসছে।
করুণ এবং বিভক্ত স্বপ্নগুলো, একটি বাচ্চা
মেয়ের স্মৃতি (যে
হয়তো তোমার নিজেরই মেয়ে), একটি গান
(মিনিয়াপোলিসের
এক বেশ্যার ক্রিসমাস কার্ড) — এসব দূরবর্তী ড্রয়ারে
রেখে
কোনো টানেলের কেন্দ্রের দিকে তুমি রওনা হয়েছ।
একটা পায়রা-টানেল, যার আলোময় ওপ্রান্তে তোমার জন্যে
অপেক্ষা করে আছে আরেকটি নৃশংস মৃত্যু।
৬
পলমল স্ট্রীটে কখনও সঙ্গীত থামে না;
এবং সঙ্গীত বলতে আমি সনাতন ঘরানার কথাই বলছি,
জ্যাজ বা রক 'এন রোল নয়।
ওখানে একটা সেলুন আছে, যার মালিক একজন
অপদার্থ
শয়তান: এটা আমার কথা নয়, লোকটারবউয়ের
সঙ্গে
আধঘন্টা আড্ডা মারলেই ব্যাপারটা জানা যাবে।
তো জানতে পারি, পলমলস্ট্রীটের সেই অপদার্থ শয়তান
একজন সঙ্গীতের সমঝদার।
পলমলস্ট্রীটের গাড়িগুলো, ট্রাফিক পুলিশ
এবং অনামা
পথচারীগণ, যারা ক্রমাগত পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খায়
ক্যানভর্তি গ্যাসের অণুগুলোরমতো এবং পরক্ষণেই
ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে,
এরা সকলেই সঙ্গীতের গভীর সমঝদার।
স্বপ্নের টেলিভিশনে পলমলস্ট্রীট আমন্ত্রণ জানাচ্ছে
সৌরজগতের সমস্ত সুরে-বিভোর এবং বোতামের ঘর
গুলিয়ে ফেলা লোকেদের।
৭
আওয়াজহীন ডিজনি ফিল্মের মতো
অন্টারিও লেকের ওপর বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টি আর
আগুনের শব্দ এই ছোটো জায়গাটায়;
একটি আত্মা নীরবে ফায়ারপ্লেসে কাঠগুলো ঠেলে দিচ্ছে
একটা বাঁকানো শিকের সাহায্যে।
কেউ কেউ বলে, মৃত্যুর আগে এখানে আসা
একটা মূর্খামি, এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে
আধুনিক শিল্পকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
রেমব্রান্টের কপিগুলো, জমানো কাঠ আর
পুরু কার্পেট
এই জায়গাটাকে স্থান এবং কাল-নির্দেশক সমীকরণগুলি
থেকে আলাদা করে রেখেছে।
কেবলমাত্র জানলাগুলো স্ক্রিনেরমতো ধরে রেখেছে
অন্টারিও লেকে বৃষ্টিপাতের দৃশ্য, আর
কয়েকটিরাজহাঁস।
আজকের তারিখ ২৩শে অক্টোবর: নাথিং টু রিপোর্ট।
ওভার অ্যান্ড আউট।
৮
অবিশ্বাস্য শহরগুলি, তাদের কৃত্রিম উদ্যান ও ফোয়ারা
নিয়ে আমাদের ভেতর ছায়া ফ্যালে; প্রকাণ্ড বড়ো ও
ছোটো সদৃশকোণীত্রিভূজের ছায়া, চৌখুপি-কাটা
বাস্তবতা আমাদের দেয়ালে ও মেঝেয়: দূরের শহরগুলিকে
যেন জানলার বাইরে তাকালেই দেখতে পাবো,
এভাবে লক্ষ্য করি টেবিলে রাখা কৃত্রিম আপেলসমূহ।
তবে কি এভাবেই বিষণ্ণতা একটা ব্যাসার্ধ কমতে থাকা
বৃত্তের মতো আষ্টেপিষ্টে আমাদের স্মৃতিকে বেঁধে
ফেলবে?
ভোরের অতিকায় টেসারেক্ট হয়তো দখল করে নেবে
আমাদের ঘরবাড়ি, শুধু দরজার বাইরে একটি বেড়াল
কাঁচের বোতল ভেঙে গড়ানো দুধ চেটেচেটে খাবে।
৯
প্রতি ঘন্টায় ষাট মাইল বেগে চলন্ত কোনো গাড়ীর
জানলা থেকে দেখা অস্পষ্ট অপসৃয়মান একটি মুখ,
যা প্রায় ক্যামেরার কারসাজিতে তোলা ভূতের ছবির মতো
আবছা, অথচ স্মৃতির চেন রিয়্যাকশন শুরু করার
জন্যে
এটুকুই যথেষ্ট ছিল; জীবনের কেন এবং কীভাবে সংক্রান্ত
প্রশ্নগুলি লোহায় মরচে পড়ার মতো
একটি ধীর বিক্রিয়ার ফলে গুরুতর হয়ে উঠতে থাকে।
এমন তো নয়, যে, এসব কিছুই আগে
ঘটেনি: যা
ঘটেছে এবং ঘটতে পারত তা খতিয়েদেখবার পরেও
বোঝা গেল শূন্য থেকেই শুরু করে সময়েরদাগহীন
স্মৃতিগুলি ছুটে যাচ্ছে ফোকাসের বাইরে, যেন দ্রুতগামী
গাড়ীর জানলা থেকে দ্যাখা, লম্বা রডের
মতোসর্পিল,
শহরের রঙবেরঙের আলো।
১০
জলপ্রপাতের নূন্যতম দূরত্বে দাঁড়ালে মৃত্যুর যে টান
অনুভব করা যায়, সেটা খুব জটিল নয়, বরং
উপভোগ্য,
অনেক উচ্চতা থেকে নীচে তাকানোর মতো।
উঁচু টাওয়ারে ক্রিসমাসের রাতে আমি দেখেছি
স্যুটপরাউচ্ছ্বল লোকেদের,অন্যসময় যারা
অচেনা শহরতলিতে বিজনেস ডিল সেরেশস্তা
হোটেলে রাত কাটায় এবং সিগারেট টানতে টানতে
মৃত্যুর কথা ভাবে। একজন হোমলেসকে আমি চিনতাম
যে ভাবত ক্রিসমাসের রাতে সরকারের পক্ষ থেকে
ভিনগ্রহীদের গোপনে এক জেল থেকে অন্য জেলে
স্থানান্তরিত করা হয়; মৃত্যু, তার
কাছে, সবসময়ই
জেল-পালানোভিনগ্রহীদের আক্রমণে ঘটা একটি দুর্ঘটনা।
ক্লাউনের মুখোশ পরা ভিনগ্রহীরা, স্বপ্নে দেখি,
ক্রিসমাসের শহরে আলোগুলো খেয়ে ফেলছে
আর নীল অন্ধকার: আয়নায় কিছু বীভৎস খুনের দৃশ্য।

কবিতায় সব কিছু থাকা সত্ত্বেও কিসের যেন অভাব।
ReplyDelete