সম্প্রতি শর্মিলা ঠাকুর বলেছেন
‘নায়ক’ সিনেমায় সত্যজিৎ রায় যে অভিনয় করে দেখিয়ে দিতেন, উত্তম কুমার তার পঞ্চাশ
শতাংশই স্ক্রিনে করে দেখাতে পেরেছিলেন। এ কথায় আমি উল্লসিত। কারণ, ‘নায়ক’ আমার অতি
প্রিয় চলচ্চিত্র, এবং এই সিনেমা আমি যতবার দেখেছি আমার মনে হয়েছে অরিন্দমের যে
শরীরি ভাষা, যে বাচনভঙ্গী, যে হাঁটাচলা... তা উত্তম বাবুর সঙ্গে যায় না। ওটা
একান্তই সত্যজিতের ভাষা। সত্যজিৎ করে দেখিয়েছেন, উত্তম ফলো করেছেন, পুরো পারেননি। এটা
আমি সত্যজিতের যে কোনো সাক্ষাৎকারের ভিডিও দেখতে দেখতেই টের পাই। আমার নিকটের
কয়েকজনকে একাধিকবার বলেওছি। তাঁরা বিশ্বাস করেননি। উত্তম কুমার বাঙালির মনে এক
এমনই ব্যাপার, সেখানে এই কথা বিশ্বাস করানোর শক্তি আমি কেন, স্বয়ং সত্যজিৎ রায়েরও
নেই। কিন্তু, ঘটনা হল, ‘নায়ক’-এর অভিনয়ে উত্তমের নয়, সত্যজিতের ব্যক্তিত্বের ছাপ সর্বাধিক।
শর্মিলা দেবীর উক্তিতে জানতে পারলাম আমার দেখতে ভুল হয়নি।
উত্তম কুমার প্রথম যখন
অভিনয় করতে এলেন, সেই ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭-৫৮ অবধি উনি যে মানের অভিনেতা, সেই তুলনায়
আজকের দেব বা জিত কিছুই খারাপ নন, বরং অনেক সচেতন ও সংযত তাঁরা। ‘বুনো হাঁস’-এ দেব
যে অভিনয় করেছেন, জীবনের প্রথম দশ বছরে উত্তম তার ধারেকাছেও আসেন না। তখন উত্তম এক
জঘন্য অভিনেতা। সংলাপ বলেন নাটুকে ভঙ্গিতে রেলগাড়ির মতো স্পিডে। হাঁটাচলায় কোনো
শৈল্পিক সুষমা নেই। লিপস্টিক লাগান দৃষ্টিকটুভাবে। এক কথায়, ওই দশ বছরের উত্তমকে
নেওয়া যায় না। ১৯৫৭-র পর থেকে ওঁর অভিনয়ে অনেকগুলো নতুন মাত্রা আসে, পরিমিতি ও
সংযম আসে। ইন ফ্যাক্ট, উনি ওই সময়ের পর থেকে, অর্থাৎ ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে
একজন পোড়খাওয়া অভিনেতা হয়ে উঠতে থাকেন। যেখানে সৌমিত্র বা বিকাশ রায় তাঁদের প্রথম
সিনেমা থেকেই অনবদ্য ও অসাধারণ।
‘নায়ক’ বেরিয়েছিল ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে।
তখন সিনেমা জগতে ওঁর প্রায় দুই দশক কেটে গেছে। ‘নায়ক’-এর আগেও উত্তম কিছু ছবিতে
ভাল এবং বেশ ভাল অভিনয় করেছিলেন, যেমন ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘জতুগৃহ’, ‘লাল
পাথর’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিচারক’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’
‘হারানো সুর’ আমার ব্যক্তিগতভাবে খুবই ভাল লাগা অভিনয় ওঁর। কিন্তু সেই অভিনয়গুলো
আমার প্রিয় হতে পারে, আন্তর্জাতিক স্তরের অভিনয় নয়। ‘নায়ক’-এর আগে জাতীয়
স্তরে বলরাজ সাহানি যে অভিনয় করছেন, বাংলার তাঁরই প্রজন্মের বিকাশ রায় যে অভিনয়
করছেন, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী যে কাজ করছেন, উত্তমের অভিনয় সেখানে নাবালক
সুলভ। তাঁর
কলকাতার রকে বসা গ্রাম্যতা কেটে গেছে বটে, কিন্তু ওটুকুই। এমন কি ‘নায়ক’
পূর্ববর্তী পরিসরে ছবিগুলিতে উত্তম যে ভাল অভিনয় করেছেন, তা তাপস পাল বা প্রসেনজিৎ
বা আবীর চট্টোপাধ্যায় বা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় করে উঠতে পারবেন না, এটা আদৌ নয়। তাপস
পাল ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ আরো ভাল করতে পারতেন, প্রসেনজিত ‘শেষ অঙ্ক’ আদৌ
খারাপ করতেন না। বাঙালির ওই সময়ের উত্তম ভক্তি এখানেই অনেকটা অযৌক্তিক। সেটা
প্রেম। সেটা বিচার নয়।
‘নায়ক’ যখন হচ্ছে, খুব
স্মার্ট হয়ে উঠেছেন তখন উত্তম। উনি চরিত্রের যে গভীরতা বলে একটা ব্যাপার থাকে, সে
ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন, সেটা ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ‘শেষ অঙ্ক’ দেখলেই বোঝা
যায়। কিন্তু সেই স্মার্টনেস তারকাসুলভ। অভিনেতাসুলভ নয়। ‘নায়ক’ –এ উত্তম প্রথম
আন্তর্জাতিক মানের পারফর্ম করলেন। এবং তারপর থেকেই অবাক হয়ে দেখা যায়, একজন মাঝারি
অভিনেতা কেমন করে সত্যিই উৎকর্ষের দিকে এগোতে শুরু করলেন। নিজেকে ভেঙে চললেন একের
পর এক সিনেমায়। দেখা গেল সেই লিপস্টিক মাখা উত্তম আর তিনি থাকছেন না। প্রত্যেক
সিনেমায় সত্যিকারের তারকা হয়ে উঠছেন মানুষটি।
তারপরেও সুপ্রিয়া দেবীর
লেখা পড়ে জানতে পেরেছিলাম ঋত্বিক ঘটক বা সত্যজিতের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার
চেয়ে বাজারচলতি পরিচালকদের সঙ্গে যেতেই ওঁর টান ছিল বেশি। ঋত্বিকের সিনেমা ওঁকে
নাকি জোর করে দেখাতে হয়েছিল, তারপরেও উনি ইন্টারেস্টেড হননি। সেটাই স্বাভাবিক। একজন মানুষের
ইন্টেলেচ্যুয়ালিটি অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে।
যে উত্তম কুমারকে আমরা
সাতের দশকে এসে ‘যদুবংশ’ ‘এখানে পিঞ্জর’ ‘নগর দর্পণে’-তে পাই, তা কিন্তু ‘নায়ক’-এর
দান। সম্ভবত কেবল সত্যজিতের শরীরি ভাষাই নয়, ওই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পরে উত্তম
হলিউডের ক্ল্যাসিক সিনেমাগুলোর অভিনয় কাজে লাগান, এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কী
অভিনয় হয়, সেটার দিকে ওঁর চোখ প্রথমবার যায়। যে সুচিত্রা সেনের পাশে উনি কেবলমাত্র
সঙ্গত করার জন্যই যেন থাকতেন, সেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গেই যদি ‘নায়ক’-এর পরের
সিনেমাগুলো দেখা যায়, দেখবেন সুচিত্রার চেয়ে উত্তমের অভিনয় অনেক বিজ্ঞানসম্মত
হচ্ছে, অনেক বেশি সচেতন লাগছে ওঁকে, যে ‘সপ্তপদী’ বা ‘হারানো সুর’-এ পারেননি,
সুচিত্রাই বাজি মেরে দিয়েছেন। এমন কি সুপ্রিয়ার সঙ্গে ‘সবরমতী’-র মতো সিনেমাও যদি
দেখেন, দেখবেন উত্তম সেখানে একজন নায়ক হিসাবে সন কোনারি বা পল নিউম্যানের চেয়ে
খারাপ করছেন না। তখন উত্তমের অভিনয়কে মার্লোন ব্রান্ডোর অভিনয়ের সঙ্গে যেন মেলানো
যাচ্ছে কখনও কখনও, কখনও যেন জেমস স্টুয়ার্ট ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছেন। এই লোকটিই যে একদা
‘ওরা থাকে ওধারে’ বা ‘সাঁঝের প্রদীপ’-এর অসহ্য পারফর্মার ছিলেন, আর আর মনে হয় না।
‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’ অতুলনীয় কাজ তখন ওঁর। ‘বিকালে ভোরের ফুল’ মুগ্ধ করে দেয়। মুগ্ধ
করে দেয় ‘বাঘ বন্দী খেলা’।
বাঙালি যে উত্তম কুমার বলতে অজ্ঞান হয়ে যায়, এটাই বাঙালির চরিত্র প্রকাশ করে। উনি একটা জীবনব্যাপী যাত্রাপথ অতিক্রম করেছেন। একজন খারাপ অভিনেতা থেকে একজন অত্যন্ত ভাল অভিনেতা ও মহাতারকা হয়ে ওঠার পথ ছিল সেটা। মোটেই এটা নয় যে, উত্তম কুমার বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। ছবি বিশ্বাস ওঁর চেয়ে অনেক বিশাল মাপের অভিনেতা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় প্রতিভার ধারেকাছেও উত্তম আসেন না, বিকাশ রায় ওঁর চেয়ে বহু বহু গুণ ভাল চরিত্রাভিনেতা। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, তুলসী চক্রবর্তীরাও ওঁর চেয়ে অনেক ভাল অভিনেতা। কারণ তাঁদের অভিনয় দিয়েই টিকতে হয়েছিল, তাঁরা কেউ মহাতারকা ছিলেন না। লড়াইটা কেবল হেসে আর সিগারেট ধরিয়ে তাঁরা জিততে পারতেন না। ‘একবার বলো উত্তম কুমার’... এটাই হল ইমেজ। আর... ইমেজটাই তো আসল রাজা বাঙালি সমাজে।
এই সমাজে উত্তমের অভিনয়
না করলেও চলত। কারণ দর্শক তাঁর হাঁটা, তাকানো, সিগারেট ধরানো, কটাক্ষ, হাসি এসবকেই
অভিনয় ভাবত, আজও ভাবে। উত্তম কুমারের কোনো দ্বিতীয় হয় না। কেন হয় না? অমন তাকাতে
আর কে পারবে? অমন হাসতে আর কে পারবে? নায়িকাকে অমন করে জড়িয়ে ধরতে আর কে পারবে?
এগুলোই বাঙালির উত্তম-ভক্তির পরাকাষ্ঠা। একবার ‘জতুগৃহ’ দেখান, পাঁচ মিনিটও দেখবে
না। কিন্তু উত্তম অভিনয় করেছেন। তাঁর জীবনের শেষ পর্বে এসে তিনি ভারতীয় সিনেমার
অন্যতম একজন অভিনেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। কলকাতার সেই সরল যুবক,
শেষ অবধি এটা করে দেখিয়ে গেছে।



অতি নিরপেক্ষ আলোচনা। খুব ভালো লাগলো।
ReplyDelete