।। বাক্ ১৪৬ ।। এই সংখ্যার কবি : শৌভিক দে সরকার ।।

 

কবি : শৌভিক দে সরকার


 

 

"উইটনেস বক্সে ওঠার আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় কবি যা কিছু লিখে রাখেন তাঁর ছদ্ম-কুঠুরির দেওয়ালে"

            (কবিতার সংজ্ঞা)

         শৌভিক দে সরকার

 

 

 

নব্বইয়ের দশকের কবি ও অনুবাদক শৌভিক দে সরকারের জন্ম ১৯৭৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারে। একটি মৃদু লাল রেখা’, ‘যাত্রাবাড়ি’, ‘দখলসূত্র’, ‘অনুগত বাফারতাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তাঁর প্রিয়তম কবি উৎপল কুমার বসু।  অনুবাদ করেছেন রোবের্তো বোলানিওর কবিতা’, ‘খুলিও কোর্তাসারের কবিতা’, সদত হসন মণ্টোর স্যাম চাচাকে লেখা চিঠি’, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার নাটক বেরনার্দা আলবার বাড়ি’, রুদ্রমূর্তি চেরানের নির্বাচিত কবিতা,‘নামদেও ধাসালের কবিতা, মার্টিন এস্পাদার কবিতা ইত্যাদিপ্রথমবাংলা ব্লগজিন বাক-এরঅনুবাদবিভাগটিদীর্ঘদিনসম্পাদনাকরেছেন।কবিতা পাক্ষিক পুরষ্কার, মল্লারপুরস্কার’‘ভাষানগর-মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরষ্কার, শালুক সাহিত্য পুরষ্কার(বাংলাদেশ)পেয়েছেন। অংশগ্রহণ করেছেন সাহিত্য অকাদেমির ইয়ং রাইটার্স মিট, অনুবাদ-ট্রান্সলেশন ফেস্টিভ্যাল, সঙ্গম হাউস ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স রেসিডেন্সিসহ ভারত ও বাংলাদেশের বেশ কিছু সাহিত্য উৎসব ও রাইটার্স রেসিডেন্সিতে২০১৮সালেস্পেনের জিওয়াররাইটার্সরেসিডেন্সি-তেঅংশগ্রহণেরজন্যশর্টলিস্টেডহয়েছিলেনতিনি। অজস্র কবিতা লিখিয়ের ভিড়ে কে কবি জানতে চাইলে অদ্ভুত সুন্দর উত্তর আসে 'বাক্ ১৪৬তম  সংখ্যার নির্বাচিত কবি' শৌভিক দে সরকারের থেকে...

"জগত কারুসভা এবং সংলগ্ন ছিটমহলগুলোয় ঘুরে বেড়ানো ব্যাকপ্যাকহীন এক পর্যটক"

 

 প্রকাশিত কবিতার বইঃ

 

| "শীত  বয়ঃসন্ধির হাসপাতাল" (১৯৯৫), 

| "একটি মৃদুলালরেখা"(২০০৫), 

| "যাত্রাবাড়ি (২০১১), 

| "দখলসূত্র(২০১৩), 

| "অনুগতবাফার"(২০১৫), | "পুনর্বাসনেরচিল" (২০১৬) ২০১৮সালেপ্রকাশিতহয়েছেনির্বাচিতকবিতারইংরেজিঅনুবাদেরসংকলন, ‘দাইভনিং নোম

 

কবির এক গুচ্ছ কবিতা

---------------------------

 

অতর্কিত পাখি

প্রান্তপাখির লেজটিও এসে পড়ে তোমার জামার ওপর! শব্দের নিমিত্ত হয়ে আধখোলা একটি জানালা তোমার ওপর এঁটে বসে। গলার সামান্য ফাঁস যেরকম হয়, দিক ও নির্মিতির ভুল হয়ে যাওয়া হিসেব। জানালার ওপর বসে থাকে লেজকাটা পাখি। শিস দেয়, নড়ে চড়ে। দেশত্যাগী কবন্ধরাও এভাবেই নড়ে, এই এক ভঙ্গিমাতেই নকল করে রাখে ন্যুব্জ বিশ্বাসের আড়াল! পাখি শিস দেয়, মারী ফুরিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে রাস্তায় হাঁটবে মানুষ, সেসব নকল করে বারবার।

 

অবাক যান

যা হয়, একটি রাতের প্রকল্প মাড়িয়ে ক্ষেত্র গঠনের দিকে চলে যায় কেউ! সবুজ ডোরেমন, প্রকল্পের মাথামুন্ডু বলতে দীর্ঘ একটি টিভির কথাই জানে সে। ছায়াকল্প, ছায়া হয়ে ওঠা সন্ত্রাস, এসব শুধু অবরোধকামী মানুষের জন্যেই পড়ে থাকে। হত্যাদৃশ্য আর ফিরে আসার মাঝখানে শুধু দরজা আটকে দাঁড়িয়ে থাকে খসড়া তালিকার শুকনো পাতা। মেঝের ওপর অন্য গ্রহের সংকেত, গ্রহাণু পুঞ্জের মতো শোলার কদম। কদমের পাঁপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফিরে আসার চিহ্ন বানিয়ে রাখে অবরোধপ্রিয় দেশের মানুষ।

 

দেশ

মেঘ ও অন্তরায় হয়ে ওঠা ফসলের বীজগুলি

পুঁতে দিচ্ছি গোপনে

মশারির নাইলনে ঘষে দিচ্ছি ব্যক্তিসর্বস্ব আঠা

আজ খুব ঘুম লেগে থাকবে চোখের আলস্য জুড়ে

আজ মাইল মাইল হাওয়ার ভেতর

উড়ে বেড়াবে আমাদের হাড়গোড়

অন্ধ হয়ে ওঠার অজুহাতে পা লিখব

হাতের তালুর ওপর!

দ্বেষ, বৈরী বাতাস নিয়ে লিখব

পাখির উঁচু হয়ে থাকা পা!

 

খুব সহজ সরল একটি মৃত্যু! পায়ের সার্বভৌমত্ব!

আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া শুকনো

ক্ষয়ে যাওয়া পা!

 

মুণ্ডু

 

রোদের অন্য পর্বটিই কালো বেড়াল!

আমি নুয়ে পড়া শাশ্বত দেখি

মাংস সংলগ্ন দুপুরবেলাগুলির যৌথ ক্ষেতখামার

রোদ কাটছে কু-বাতাস

রোদের জরদ কেটে প্রতিভার কারুকাজ লিখছে

লঙ্কার ক্ষেত!

পৃষ্ঠা বাঁক নিচ্ছে

অক্ষর, দাগ, ভুল কালির ক্রমগুলি ডিঙ্গিয়ে

পা ফেলছে রোঁয়া ওঠা বেড়াল

 

সমষ্টি রহিত একজন কাকতাড়ুয়া লক্ষ্য করছে এইসব!

 

উদালগুড়ি

 

খোলা আখার ভেতর পুড়ে যায় চোখের পাতা

স্বরহীন একটি নিষাদ লিখি পাতার ওপর

কয়লার গুঁড়োর ওপর ছড়িয়ে দিই পাতার ছাই

ছদ্ম সংসারের গন্ধ, অচেনা সীসার কামড়

ভেসে থাকার শর্ত, জিয়া-ধানসিড়ির পোড়া বালি

 

ফুসফুসের ডানদিকে লেগে থাকে বাসি রক্তের দাগ

ফুসফুসের বাঁদিকে ত্রাণ শিবিরের ছাই

 

ছাই হয়ে উড়ে যায় জমি জরিপের যন্ত্র

অধিগ্রহণের সূত্র, সচিত্র ভোটার কার্ড

 

ছাইয়ের পাহাড় ডিঙিয়ে কল্পনার একটি অতীত লিখি

উদালগুড়ি, মৃত মানুষের আঙুল লেগে

আমার চোখের পাতা পুড়ে গিয়েছিল এখানেই

 

খয়েরি প্রজাপতি

 

ক্রমশ একটি মাঠ, প্রান্তর হয়ে ওঠে

ক্রমশ একটি চরাচর, জানালার দীর্ঘসূত্রতা ডিঙ্গিয়ে

খুলে দেখায় চৈত্রসংক্রমণের প্রকৃত দৃশ্যগুলি!

হাওয়ার অশন কেঁপে ওঠে

লিফলেট, গতিবিরুদ্ধ হাওয়ার ডানা কেঁপে ওঠে

সংকেত, সাঁকো, তাপপ্রবণ একটি মৌজার সাকিন!

 

অধিগ্রহণের পর সংক্রমণের চিহ্নগুলি

আর মনে রাখিনা আমরা

অর্ধেক দুপুরের সবুজ আর মোবিলের পোড়া দাগের

ওপর এসে বসে অতর্কিত লোকশ্রুতি!

 

রায়ডাক

.

বর্ষাপ্রকল্পের অনিয়ন্ত্রিত মাসগুলি

সংকেতের সবুজ থেকে আমি তুলে নিচ্ছি চরাচর

গড়িয়ে যাওয়া পাথর, জলের গহন

জলের আরও নীচে গাঢ় উঠছে ভুটান পাহাড়

মুখ নীচু করে ফিরে আসছে বালি-বজরির ট্রাক

এই বছরের সংক্ষিপ্ত কাশিয়ার চর

শর্তসাপেক্ষ একটি নৌকোর মুখ ক্রমশ ফিরিয়ে দিচ্ছে

আমাদের পূর্ব স্মৃতির পিকনিক

 

.

এই নিরুদ্দিষ্ট পৃথিবীটিও তোমার

ব্যহত নীল আর শাদা জ্যোৎস্নার ভেতর

আমিও লুকিয়ে রাখছি একটি প্রাচীন প্রসবক্ষেত্র,

বালি ও কাঁচের দ্বৈত মহড়া

শীর্ণ সাঁকোটির প্রতিচ্ছবি, শীতের মরুচমতি

লুকিয়ে রাখছি হাওয়ার শিবির

নিঃস্ব বসতির দিকে এগিয়ে যাওয়া কাঙ্খিত ভোর

 

দেশ রাগ

 

প্ররোচনা ও অংশগ্রহণের জুয়াছক

অহেতুক একটি বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়ছি আমি

সংক্রামিত আবাদ, চীনা পেতলের সামান্য চাবি

আংশিক বশ্যতা ভেবে আমিও ঢুকে পড়ছি

বৃত্ত বিন্যাসের ভেতর, শাদা পাঁউরুটির ভেতর

লক্ষ্য করছি পরবর্তী পান্টারের হাতযশ

নিষ্ক্রিয় বসন্ত, দেওয়াল অবধি বেড়ে ওঠা

অতিপ্রাকৃত ইতিহাস

 

"বাক্" এর জন্য দুটি নতুন কবিতা 

------------------------------------------------- 

 

লুব্ধক

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন ছড়ছর করে পেচ্ছাপ করে দিল। আমি ছাদের আলস্য থেকে মুখ বের করে লোকটার পেচ্ছাপ করার আকুতি দেখলাম।লাবণ্য আর হিম ঝরে পড়া অক্টোবর আকাশের নীচে কোনও মানুষের মুখ আলাদা করে চেনা যায় না। মাথাকাটা ভূতের মতো মনে হয় সবাইকে। দেওয়াল খুলে জড়ো করে রাখা বাড়ির লোহা, জং আর পাথরকুচির ওপর দেখলাম পেচ্ছাপরত একটি ছায়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে মারীর বিজ্ঞাপন আর স্বাস্থ্যশিক্ষার লিফলেট।

 

 

কালো বাক্স

আধখাওয়া একটি রাতের বিস্তার দেখছি

ওহো, পিগিব্যাক সাঁইয়া!

শুয়োরের ঘাড়ের রোঁয়ার মতো উঁচিয়ে ওঠা রাত

এসব রোঁয়ার ওপরেই আমাদের যাকিছু বেলুন খসে পড়ে

হাওয়া চুপসে শেষ মুহূর্তে ফেটে যায় ঠাণ্ডা, ধাড়ি বেলুন

বেলুন খণ্ড, মাংস খণ্ড মেঘ হয়ে আকাশে ভাসে

জ্যোৎস্না রহিত আকাশ, খুব নীচে নেমে আসা মেঘের পেট

অনেকদিন পর জ্যোৎস্না খোঁড়ে কেউ

ফেঁড়ে যাওয়া প্লাস্টিকের নীচে ফেলে রাখে

রহস্যপ্রণালীর আতশ, কড়হীন আঙুলের ছাপ

 

 

 

 

'বাক্ ১৪৬' তার ১২ বছরের জার্নির এক অংশের অন্যতম বিভাগীয় সম্পাদককে 'এই সংখ্যার কবি' নির্বাচিত করতে পেরে অন্য দিগন্ত ছুঁল

 


1 comment:

  1. ভূমিকাংশটায় শব্দগুলি জড়িয়ে গিয়ে তালগোল পাকিয়েছে কেন? নাকি আমিই কেবল এমন দেখছি!

    ReplyDelete